গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ৫

posted Apr 21, 2011, 12:23 AM by RA HAT
মুসুর কাশি হয়েছিল। ময়মুনা বাচ্চাটার ছোট পিঠে কুসুম গরম তেলে লং দিয়ে মালিশ করেছে। ফুলির মা মেয়েকে নিতে এসেছিল। বুদ্ধি দিয়ে গেছে । এখন বাচ্চাটা উপুর হয়ে ঘুমাচ্ছে।
মামুন ঘুমাতে গিয়ে ঝিম মেরে হয়ে শুয়ে আছে। ময়মুনা নিরবতা ভাঙে। কিছু হইছে? আপনের কি শইল খারাপ?
না
মাথা বিশ করে? টিপ্পা দিমু? সোহাগ করে বলল ময়মুনা। উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে না সে। হাতের চুড়ির রিনরিন শব্দ করে বাজে । মামুন কপালের ছাদে পরিচিত নারীহস্তের স্পর্শ অনুভব করে । সাবান খাওয়া মধ্যমা, তর্জনী। শিরিষ কাগজের মতো রুক্ষ্ম। হাতের তালু জমে যাওয়া বালিশের মতো শক্ত।

ময়মুনা কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু বলল না। স্বামীর মৌনতায় কষ্টের কিছু কিছু না বলাই ভাল । রাত অবশ্য তেমন বেশি না। শিয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। কয়েকটা ঝিঁঝিঁ পোকা পাল্লা দেয়। অচেনা নৈশ পাখি শীষ দিয়ে ডেকে উঠতেই ময়মুনা অধৈর্য হয়ে মুখ খুলল,
শহীদুলের লগে দেখা হইছে? হে আইছিল।
আবার আইছে? কোন সময়?
মগরিবের আজানের ঠিক আগে
ক্যান? শয়তানডা আবার কি চায়? দুধ কলা দিয়া গোখুর পালতাছি মন হয়। জানো হেয় কি করে। আমি যে বিস্কুট কিনি হেইডা দিয়া বারেক মিয়ার চায়ের দোকান লাভ করে। নিমক হারাম! মামুনের গলায় পাটা কাটানো বাটালির মতো আগুন চমকায়।
ময়মুনা দুঃসংবাদটা স্পষ্ট করে বলে,
শহীদুলের বইন জরিনার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। মন হয় বাঁচান যাইব না।
মামুনের বুঝতে পারল শহীদুল পয়সা বাগাতে একলা ঘুরে গেছে । সে বলল, শহীদুলরে পাচ পয়সার বিশ্বাস নাই। যেই পোলা হুদ্দর বইনের মরণের বাহানায় পয়সা তুলে আর বিড়ি টানে হে সবই পারে।
ময়মুনা বোঝাতে চেষ্টা করে,
নাগো মুসুর বাপ, ফুলির বাপ শুইনা আইছে। মাইয়াডা আসলেই খারাপ।
ফুলির বাপ!
হ। উনি দুপরে বিছুন ধান কিনতে থানার সিড স্টোর গেছিলো। অষুধের দোকানে শুইনা আসছে থানা হাসপাতালে জরিনা সারা রাইত খিঁচছে। এরপরে আর চেতন আসে নাই।
শহীদুলের মা বাড়িতে একলা। হে পাগলার মত কানতাসিল । আহহারে পোলাডা কেমনে এগুলান সামলায়।

জরিনার অসুখের নাম লয়া শহীদ মিছা কইতে গেল ক্যান? বাকের মিয়ারে কইছে ডাইবেটিস। আমারে কইছে সন্তান হইব। মামুন শহীদের আচরণটা ভুলতে পারে না।

শহীদুল মন হয় শরমে অসুখের নাম ঠিক কয় নাই। তার বইনের জামাই জরিনারে ফালায়া সউদি গেছে তিন বছর। গিয়া নিরুদ্দেশ। কেউ খবর দিসে মাটি কাটতে গিয়া মইরা গেছে। কেউ কইছে হে বিয়া করছে। এর ননদ শাউরী খারে দর্জাল। লাথ্থি দিয়া বাইর কইরা দিসে।
পরে?
মাইয়াডা হের বাদে নানান বাড়িত কাম করছে।
অত পেচাও ক্যান, ঘটনাডা আগে কও - অসহিষ্ণু হয়ে বলল মামুন।
তালুকদার বাড়িতে কাম করতে গিয়া সর্বনাশ হইছে । বাচ্চা পেডে মাইয়াডা চুপে চাপে করিমন বেওয়ার কাছে গেছিল ।
কি কও! এমুন কাম কেডা করছে? - কৌতুহলী হয় মামুন জিজ্ঞেস করে। ময়মুনা নিশ্চিত জানে না। সে বলল,
ফুলির মায় শুনছে সুরুজ তালুকদারের মাইঝলা পোলা মফিজ্যা। গুণ্ডামি করে, ইস্কুলের মাঠে রাইতে গাঞ্জা টানে। আবার কেউ কয় তালুকদার নিজেই..পোলার চেয়ে বাপের স্বভাব বেশি মন্দ।
.
জরিনা কি জানে না তালুকদার বাড়িডা কত্ত খারাপ? হে জাইনা শুইনা গেছে ক্যান? পয়লা বেশি পাওনের লোভে? তারপর পুরনো ক্ষোভটা তুলে বলল,
যেমন শহীদুল তেমন তার বইন!

এইডা কি কইলেন, প্রতিবাদ করে ময়মুনা। জরিনার দোষডাই দেখলেন? যে পুরুষডার এমুন করল হের দোষ নাই? মাইয়াডা সোজা সরল।
মামুন ক্ষেপে গিয়ে বলল, বেশি বুইঝো না। মাইয়াগো লাইগাই আদমেরা বিপথে গেছে।

ময়মুনার খারাপ লাগে। মামুনকে তার আর শিক্ষিত মন হয় না। সে মাঝে মাঝে জংলী পুরুষের মত কথা কয়।
শহীদরে কিছু দেওয়া হইছে? অখন কই?
ময়মুনা বলল, হ দিসি। আমার বিয়ার যে কানের দুল আছিল হেইডা শহীদরে দিসি।
আমগো যে সুময় খারাপ দিন গেছে জরিনারবাপ জুলহাস চাচায় কত কিছু দিসে। কবে যে কার দিন খারাপ হয় আল্লা ছাড়া কেউ জানে না।
দীর্ঘ সময় থেকে হারিকেনটা উজ্জ্বল মনে হয়। পৈত্রিক সুত্রে প্রাপ্ত কাঠের আলমারীর ছায়াটা আড়াআড়ি ভাবে পড়ে। বনের ভেতর টিঢঢি পাখির শব্দ হয়।
কেউ যেন বাড়ির আঙিনা দিয়ে চলে যায়।
দীর্ঘ নিরবতা ভেঙে ময়মুনা বলল, আপনে কাইল একটু জরিনারে দেইখা আসেন,
মামুন সায় দিল, আচ্ছা।

মামুন সকালে কোখাও যেতে পারবে না ।জমি বিক্রির কথা মধ্যে কথা প্রায় পাকা করে এসেছে। কাল সমিতিতে সব ঠিক ঠাক হলে বুধবার জমির বায়না করার জন্য "আশাবাদীর" অফিসে কমিটির তিনজনের থাকার কথা। ময়মুনা একসময় সমিতিতে সময় দিয়েছে। তাকে জানাবে বলেও জানাল না।

বারেকের বুদ্ধি হল জমিজমার হিসাবে মেয়েছেলেকে টানলে ভেজাল বাড়ে।

মামুন ঘুমানোর জন্য অন্যপিঠে ঘুরে শুয়ে থাকে । ময়মুনা অস্থির হয়ে ঘুমের ভেতর ডাকে, ঘুমাইছেন?
না, কও।
আপনে আমার হাতডা একটু ধরবেন। আমার খুব ডর লাগতাসে। ময়মুনার মনে হল তার স্বামী তাকে ফেলে নিরুদ্দেশ চলে যাবে!
মামুন অনিচ্ছুক হাতটা হাতে রাখতেই মেয়েটা স্বামীর বুকে মাথা গুঁজে হু হু করে কাঁদতে থাকে। বলে, আমি অসহায় মানুষ। জগৎ সংসারে বাপ নাই, বইন নাই, আপনে ছাড়া কেউ নাই। আমারে ফালায়া আপনে কোন জাগায় যাইবেন না।
Comments