গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ৪

posted Apr 21, 2011, 12:22 AM by RA HAT
ময়মুনা খাওয়ার পর শুয়ে ছিল। এমন সময় ফুল মতির টেনে টেনে কান্নার শব্দ শোনা গেল। কান্নাটা তার বাড়ির দিকে আসতে থাকে। দরজায় থামে। ময়মুনা ডাকে, কি হইছে রে ফুলি? মায়ে মারসে? কি করছিলি?
কিছু করি নাই। কুলসুমের লগে একটু পুস্কুনিতে ডুবাইছিলাম ।
আহহারে, আয় এদিকে। মেয়েটার চোখ টকটকে লাল। ময়মুনা হাত বাড়িয়ে ফুলির কপাল ছোঁয়।
জ্বর বান্দাইতাসস মন হয়। অকখনি বাড়িত যা ।
যামু না, আমি তোমার এইখানেই শুয়া থাকুম।
ঠিক আছে, শো।
কাঁথা পেড়ে দেয়। ফুলমতি বাধ্য মেয়ের মত শুয়ে পড়ে। বলে, আমার মা খারাপ। খালি মারে।
ময়মুনা সস্নেহে মেয়েটার ছোট কপালে হাত বুলায়। ভেজা চুলে বিলি কেটে দেয়। মেয়েটা আরাম পেয়ে চোখ বন্ধ করে আর বলে, মামী, তুমি যদি আমার মা হইতা ।মেয়েটার কথা শুনে ময়মুনা কপট রাগ করে, এই পটপটানি, আমি কি তোর মা না?
****
চৈত্র মাসে ময়মুনারও মায়ের কথা মনে পড়ে খুব । তার মা নিজের হাতে ফুল তোলা পাখা বানাতো। ছোট বেলায় সেও মাকে জড়িয়ে ঘুমাতো। একদিকে ঘুমাতো সে, অন্যদিকে ছোট বোন তাহমিনা। গরম পড়লে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে মার হাত ধপ করে পড়ে যেত । ময়মুনার সহজে ঘুম আসত না। প্রতিদিনই ছোট ছোট কষ্টের ঘটনা হত। জমে জমে সেটা শিশু মনকে বিষাক্ত করে দিত।

তাহুর কি একটা অসুখ হয়েছিল ছোট বেলায়, প্রায় রাতেই পেটের ব্যথায় কাঁদতো। মা থানকুনি বাসক পাতার রস দিয়ে কি একটা বানিয়ে দিয়েছিল। সাময়িক উপশম হত। একবার তিন দিন জ্বর আর বমি হলে তাকে আজানের সময় রিক্সায় করে থানা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঢুকতেই এক আয়া বাবাকে বলেছিল, আপনের ওই মাইয়াডাই বড়?
কোনডা?
ঐ যে পর্থমে ঢুকলো, ল্যাংড়ায়া ল্যাংড়ায়া হাঁটে যে। শেষ কথাটা মাটিতে পড়ার আগে ময়মুনার বাবা খেঁকিয়ে উঠেছিল, এই বেডি, মুখে আল্লা কি কোন আক্কল জ্ঞ্যানের পর্দা দেয় নাই?

ময়মুনার চোখে পানি আসার কথা। তার খোঁড়া পরিচয়টা সে জেনে গেছে। স্কুলের সহপাঠী থেকে মক্তবের হুজুর তাকে এই বিকলাঙ্গত্বের পরিচয়ে ডাকত। যারা ডাকেনি , তাদের একই কৌতুহল পায়ের আঙুল কেন নেই। হাটতে চলতে, পথ চলতে সবারই নজর তার অসমর্থ শরীরের দিকে।

তার বয়স যখন বার-তের বছর পনের মাইল দক্ষিণে অলকাকান্দা গ্রামে ফুফাতো বোনের বিয়ে খেতে গিয়েছিল । ফুফার অঢেল সম্পত্তি ছিল। কন্যার বিয়ে দিয়েছিল সিলেট টাউনে। শিক্ষিত পরিবারে। খুব সাজানো হয়েছিল বাড়িটা। মনে পড়ে সেই পক্ষের এক ছেলের কথা। লম্বা আর ভদ্র। খুব সুন্দর করে হেসে কথা বলেছিল। সে হয়তো জেনেছিল তার শরীরের কথা, কিন্তু একটিবারও এ বিষয়ে প্রশ্ন করে নি। শহরের ছেলেরা কি এত ভাল হয়? ভেবেছিল ময়মুনা।

তার দুদিন পর তাহু বোনের কাছে স্বীকার করে যে ছেলেটি তাকে ফুল দিয়ে চিঠি লেখার ঠিকানা দিয়েছিল। আর বলেছিল যাতে ময়মুনা না জানে। এটা শোনার পর ছেলেটির জন্য খুব ঘৃণা হয়েছিল।

অবশ্য কিছু সুখময় ঘটনাও সে দেখেছে। বর্ষার গাঙের মতো কষ্টের কাদা ধুয়ে দেয় সেই স্মৃতি ।

ময়মুনার বাবা বিকালে ঘরে ফিরলে দু'বোন ছুটে যেত । রাতও হয়ে যেত মাঝে সাঝে। কুপি বাতির আলোয় খাবারের আয়োজন হত। তাকে পাশে বসিয়ে তাহুকে কোলে নিয়ে ঠাণ্ডা সাদা ভাতে সালুন ঢালত বাবা । তাহুর গায়ের রং উজ্জল ফর্সা, চোখ গুলো মার্বেলের মতো স্বচ্ছ আর গভীর । তাহু বড় বোনের ভিষণ ভক্ত ছিল । ময়মুনা মোরগের শব্দের আগে জাগত। জেগে পা টিপে টিপে দরজার খিল খুলে বের হওয়ার সময় তাহুও জেগে উঠত। সে চোখ চোখ কচলে তাকে অনুসরণ করত। বলত, বুবু আমি যামু।
মুখে হাত চাপা দিয়ে ময়মুনা ফিস ফিস করে বলত, চুপ কর! মায়ে গলায় পাড়া দিব।
যত বড় হয়েছে মায়ের বিধি নিষেধ তত বেড়েছে। তবুও ঘরে মন থাকত না ময়মুনার। ভোরের আলোয় শিউলী আর বকুল ফুলের গাছে টিউটি পাখি ডাকে । গাছের নিচে শিউলী ফুল স্তুপ হয়ে আছে। জামা মুড়ে থলের মতো করে ফুল বোঝাই করে আনত। তারপর রঙিন সুতোয় মালা গেঁথে আয়নায় ঝুলিয়ে রাখতো।

স্মৃতিগুলো সাবানের ফেনায় রঙের মত প্যাচ খায়। কোনটি আগে কোনটি পরে মনে থাকে না। ময়মুনা মনে করতে পারে না সেই ঝড়ে রাতটিকে। আকাশ কি লাল হয়েছিল? বিকালে কি মা কিছু বলেছিল? তার বাবা কোথায় গিয়েছিল? অলকাকান্দা? তখন কি ময়মুনার ফুফা অসুস্থ ছিল? কত সন? পাশের বাড়ির সালমাদের টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে যায় কোন বার? বিজলী চমকালে চালের উপর দিয়ে আলো আসতো। জানালার কপাট চুয়ে ঘরে পানি কাদা হত। টিনের চালে শাখা আছড়ে পড়লে মনে হয় ভেঙে যাচ্ছে। মা দোয়াদরুদ পড়ে ফুঁ দেয় তাদের বুকে ।

তবে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া মায়মুনার জন্য সহজ ছিল না। কেননা সবচেয়ে কাছের স্কুলটাও দেড় মাইল দুরে। সপ্তাহে দু'দিন করে গিয়ে বাকিটা নিজে নিজেই পড়ত। কিন্তু পড়তে বসতেই মা চেঁচাত, মাইয়া মানুষের বিদ্যার দাম চাইর আনা । যা পেঁয়াজ রসুন কাট, চুলার ডাইলডা বাগাড় দে। তাহমিনার পড়তে চাইত না। সে যত বড় হল সাজগোজ বাড়ল । ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় থেকে তাহমিনার জন্য প্রস্তাব আশা শুরু হল। লোকে কথা ছড়াচ্ছে বলে একসময় দু'বোনেরই পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়া হল।

***
স্বামীর জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষায় থেকে সন্ধ্যায় সাইকেলের ঘন্টা শোনে ময়মুনা। স্বামী ঢুকেই খাবারের জন্য অস্থির হয়। মামুনকে খাওয়া শেষ করে রাতে শুয়ে হারিকেনটা কমিয়ে ময়মুনা জিজ্ঞেস করেছিল,
আইকা খাওন লইয়া অনেক বেইল পর্যন্ত বইসা আছিলাম। আইলেন না যে?
আমু কেমনে? তুমি জান না যে শহীদুল দোকানে নাই? দোকান ভর্তি মানুষ, দম ফালানির উপায় নাই । এর পরে আইজকাও মালামাল কিননের জন্য পাইকারের ঐখানে যাওন লাগছে। ময়মুনার মনে হয় মামুনের গলা কাঁপছিল। যেন সে কিছু লুকাতে চায়।
Comments