গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ২

posted Apr 21, 2011, 12:17 AM by RA HAT
কোলের ছেলেটা ঘুম থেকে উঠেই কেঁদে উঠবে, সেজন্য বাড়ির সামনের পুকুরে কাকের মতো ডুব দিল ময়মুনা । ঘাটে পূবপাড়ার হরিদাসী আর ফিরু কাপড় কাঁচছে। ফেনা দুলে আসছে তার দিকে। শাড়ীর ভেতর সাবান সহ হাতটা চালান করে দিয়ে শরীর ডলে নেয়। নুয়ে পড়া ডালে একটা মাছরাঙা। পুকুর পারে জোড়া আম গাছের একটাতে টক আম, অন্যটা সিন্দুরে মিঠা। হলুদ মঞ্জরীতে মাছি উড়ছে ।

স্নান শেষ হয়ে গেল। লেপ্টে থাকা শাড়ীতে পা টেনে বাড়িতে ঢুকে সতর্ক চোখে চারদিকে দেখে নিল সে। উঠানে লাল কুকুরটা ভিভ বের করে তাকিয়ে আছে। ভেজা আঁচলটা ঝট করে পিঠ থেকে সরিয়ে নিল। বাচ্চা হওয়ার পর গাঁয়ের মেয়েদের লজ্জা কমে যায়। অনাবৃত অংশ রোদ পোহায়, ভিজা শরীরে ঝির ঝির বাতাস বয়। সারাক্ষণ খোলা রাখতে মন চায় ময়মুনার। ভাবে পুরুষ মানুষের কত আরাম । গুনগুন গান গান করতে করতে ভেজা আঁচল দড়ির মতো চিপে ধনুকের ছিলার মতো চটাস চটাস শব্দে চুল ঝাড়ে । পর পর দুটো বাচ্চা মারা গেছে ময়মুনার। মুস্তাক হওয়ার পর থেকে হাটতে চলতে শরীর ঝাঁকি খায়। লাবন্য নষ্ট হয়েছে। কোমর পর্যন্ত চুল ছিল এখন এক বিঘতে ঠেকেছে।

মুসু তখনও ঘুমাচ্ছে । ছোট ঘরের মাটিতে রাখা সিলভারের ডেকচিতে কৈ মাছ দিয়ে পালং শাকের ঝোল। মাটির ঢাকনা খুলতেই গরম ভাতের ভাপ উড়ে আসে নাকে। কেউ একজন ঢুকল দরজা দিয়ে। পায়ের চপল শব্দ চিনতে ভুল হয় না। কেডা ফুলমতি?
মেয়েটা বলল, হ মামী। মামা নাই?
না, মন হয় আইব না। কই জেন যাইব।
তয় কি মামারেই খালি লাগে, আমারে না?
মেয়েটি ভুল ভাঙাতে কাছে আসে। বিড়ালের মতো কাছে এসে ঘুর ঘুর করে যাতে মামীর তার ভুল ভাঙে। মাটির দেয়ালে ঝোলানো পুরনো ছবিটা দেখিয়ে বলে
মামী, আপনে কত সুন্দর আছিলেন আগে।
অখন নাই? - হাসে ময়মুনা
না - ফুলমতি বেফাস সত্যি বলে ফেলে। মিথ্যে বলা রপ্ত হয় নি তার। ময়মুনা ছল অভিমান দেখাতে বলে,
তাইলে তোর মামারে একটা নতুন মামী আনতে কই। কমু?
না, না, মেয়েটা বিব্রত হয়ে ছুটে আসে। সমাধানটা ভাল না
ময়মুনা জানে ফুলমতি কখনোই এমন প্রস্তাবে রাজী হবে না। এমনকি ময়মুনার বিকলাঙ্গ পায়ের কথা শুনেও না। অন্যরা অক্ষমতাকে গ্রহণ না করলেও ফুলমতি করেছিল। সে শুধু প্রশ্ন করেছিল, মামী কেমনে হইছে এমুন?

******
ময়মুনা নিরব থাকে। উত্তরটা ময়মুনার জানা নেই। এটা জন্মগত সমস্যা। হয়তো কোন অভিশাপে আল্লাহ তাকে আঙুলগুলো দেয় নি। জন্ম থেকেই সে জানে সে এমন। মা বলতো দেওয়ের বাতাস লেগেছিল। সে দৈনন্দিন কাজ করে, খুঁড়িয়ে চলে, আর কাপড়ে ঢেকে অক্ষমতা ভুলে থাকতে চায়।

ময়মুনা দেখল ফুলমতি চলে যাচ্ছে। আমি গেলাম।
খাড়া একটু
একটা বাটিতে কইমাছের ঝোল দিয়ে ঢেকে ফুলমতির হাতে দিল। নে তোর মায়েরে দিস। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল, আর তখুনি শিশুপুত্র মুস্তাক তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।


******
মেয়েটা এত টাকা পায় কোথায়? মামুন মোবাইলটা ঘুরে ফিরে দেখছিল। মেয়েটা তাকে রেখে পিছনে গেল। হাতে করে নিয়ে কেয়া সাবান নিয়ে আসল।
আপনে কি মমিন ভাইজানরে চিনতেন?
মমিন! - মামুন বিস্মিত হয়।
ও, তাইলে চিনেন না । বখুরার সৈয়দ বাড়ির সন্তান। হুনছি মমিন ভাইজানগো ঢাকায়ও তিনডা বাড়ি আছে। আমগো সমিতির ইলেকশনে আইছিল। দেখছেন মন হয়।
হু - মামুন ফোনটা চেপে চার্জ দেখতে থাকে
মোবাইল কি মমিনের? মমিন দিসে?
কি যে কন আপনে। দিলেই কি আমি নিমু?
জানেন ভাইজানরে আম্মায় খুব ভালা পায়। আমার জন্য প্রস্তাব আনছে। মানুষ খারাপ না কিন্তু ..
কিন্তু কি - মামুন বিস্মিত হয়।
উনারে আমি বিবাহ করুম না। ইসসিরে মুখ ভরতি কালা বরোন । আমি কই, এই যে আপনেরা আপনেগো ইস্কিন কত ভালা।
মামুন অবশ্য জানে সব মানুষই দাগহীন মুখ পছন্দ করে। সুরাইয়া তাকে মনযোগ দিয়ে দেখেছে ভেবে সে একটু গর্বিত হয়।

মেয়েটা ততক্ষণে একটা উপটানের প্যাকেট নিয়ে বলল, ভাইজান এইডা নিলাম। লেইখা রাখেন। পরে টেকা দিমুনে।
মামুন বাধা দেয়। না, না, বাকি দেওন সম্ভব না।
ক্যান, আমারে বিশ্বাস হয় না? মেয়েটা ছল করে। খলিফা কাকারে জিগান, উনি জামার মাপ নিসে। সোমবার কামিজ নিতে আমু তো।
তয় সেইদিন এগুলান নিলেই হয় হয় না?
ভাইজান! আপনে যে কি। বইখাতা ছাড়া যেন কিচ্ছু বুঝেন না -- গদ গদ গলায় সুরাইয়া ভেঙে পড়ে, কাজল চোখে সরাসরি চায়।

সে কি বোঝাতে চায় মামুনের স্পষ্ট হয়ে যায়। সুরাইয়া বলে,
আমি এইখানে আইলেই আপনের খোঁজ নিতে আসি। দুকানে তো আপনে থাকেনই না। সমিতির কেলাসও লন না।

মৌনতায় সম্মতি পেয়ে সুরাইয়া উপটানের প্যাকেটটা তার ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে।
নেন, এই দুইডাও খাতায় লেইখা রাখেন। মামুন বাধ্য ছাত্রের মতো লিখল, সাবান ১টা, ঠোটপালিশ ১টা।
সোমবার বৈকালে আসুম। থাকবেন না?
মেয়েটা মনে হয় জানে বিকালে দোকান নির্জন থাকে।
থাকমু। আর আমি না থাকলে শহীদরে দিয়া গেলেও চলব।
না, আপনেই থাকবেন। আরেকটা কারণে দরকার আপনেরে। বলেই ঠোঁট চেপে রহস্যময় একটা হাসি হাসল।
এইডাও নিলাম। বলে চিপসের একটা প্যাকেট তুলে নেয়।
হাল ছেড়ে দেয় মামুন। ফোনটা ফেরত দেয়। বলে, মোবাইলে চার্জ আছে। মিনিট নাই। সোমবার দিনআমি কার্ড আনায়া রাখুম। তখন দেখায়া দিমু।

সুরাইয়া বিদায় নিয়ে নেমে যায়। সম্বিত ফিরে পেয়ে দ্রুত ক্যাশবাক্সে ভাল করে তালা দেয়। তারপর দোকানের ভিতরের ছোট ঘরের
খাটের নিচে রাখা লোহার ট্রাঙ্কে বাক্সটা ঢুকিয়ে দোকান বন্ধ করে দেয়।
(চলবে)
Comments