গল্প: দ্বন্দ্ব সমাজ - ৬

posted Apr 21, 2011, 12:24 AM by RA HAT
এর পরদিন জমি বিক্রির চূড়ান্ত আলাপ হয়। এরপর বারেক, জব্বর আলি ও মামুন জরিনার খোঁজ নেবার জন্য থানা কমপ্লক্সে যায়। সবাই চাঁদা তুলে তাকে জেলা হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যভাবে পুরো অর্থের অর্ধেক দেয় বারেক। রবিবার বিকালে শহীদুলের বোনের উন্নতি ঘটে। সন্ধ্যায় সে কথা বলে। বারেক ও মামুন এক সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসে। ফেরার পথে বারেক বহুবিবাহের পক্ষে কথা বলতেই থাকে। মামুন বিরক্ত হয়। তবে সে ভুলে যায় না পরদিন সোমবার। থানা থেকে ফেরার সময় ফোন কার্ড কিনে আনতে ভুলে যায় না।

সোমবার সকালে বাজারে সালিশ হয়। তালুকদারের বাড়ির বিরুদ্ধে গ্রামের সবাই ক্ষিপ্ত হয়। কেউ কেউ জরিনাকে খারাপ মেয়ে বলে গ্রামছাড়া করতে বলে। বারেকের সঙ্গে তালুকদারদের পৈত্রিক বিবাদ থাকায়, সে তার বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেয়। গ্রামের মৌলানা স্বাক্ষী ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা নাজায়েজ ঘোষণা করে। শুক্রবার দিন বাদ জুম্মা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে এই বলে সবাই বাড়ি ফিরে আসে।

সোমবার দিন দুপুর গড়িয়ে গেলেও দোকান খালিই থাকে। মামুন পকেট থেকে ফোন কার্ডটাকে বের করতে থাকে আবার ঢোকায়। একসময় গোলাপী পোষাকে সুরাইয়া ঢোকে। সে হেসে বলে যে তার জমানো টাকাটা অন্যত্র খরচ হয়ে গেছে। আর জরুরী প্রয়োজনে চুলের শ্যাম্পু দরকার। সেটা সে বাকিতে নিতে চায়। সে দুদিন পর এসে পয়সা দিয়ে যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। মামুন সেদিনও সুরাইয়ার লাল জুতো দেখে। পায়ে নখে লাল নেলপালিশ দেখে মুগ্ধ হয়। তার চলা ফেরায় ছন্দে মাদকতা অনুভব করে। মামুন ফোনে কার্ড ভরে অনেক সময় নিয়ে বুঝিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সুরাইয়া অল্প সময় পরেই চলে যেতে চায়। তবে যাবার আগে বলে যায় তার দুটি বিবাহের প্রস্তাব সে ফিরিয়ে দিয়েছে। আর তার পছন্দ মামুনের মতো লম্বা সুদর্শন কাউকে। ফিরে যাবার সময় মামুনের কাজলে আঁকা বড় বড় চোখ তুলে চেয়ে থাকে দু বার এবং হেসে ফেলে।
মামুন যাবার আগে দোকানের মোবাইল নম্বরটা লিখে দেয় টালী খাতার পাতা ছিড়ে। মোবাইলটি দোকানে থাকে। কিন্তু এর পর মামুন বাড়িতে নিয়ে আসে সেটাকে।

আর পরদিন বিকালে মামুন সুরাইয়ার ফোন পায় এবং সুরাইয়া মোবাইল ব্যবহার শিখতে পেরেছে জেনে সুখী হয়। সে তাকে যখন প্রয়োজন ফোন করতে বলে। সুরাইয়া প্রতি সপ্তাহে নানান ছুতোয় দোকানে আসে। তেল, চুড়ি, স্নো, শ্যাম্পু যেটা লাগে বাকিতে নেয়। অন্য হিসাবের চেয়ে সুরাইয়া মামুনকে আলাদা দেখে।

একদিন রাতে তারা সবাই শুয়ে পড়েছে। শিশু কোলে ময়মুনা ঘুমিয়ে পড়েছে। এমন সময় মোবাইল ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে। মামুন দ্রুত দরজা খুলে মোবাইলে ফিস ফিস করে কথা বলে। সুরাইয়ার কার্ডে টাকা শেষ হয়ে যায়। ময়মুনা এত রাতে কে ফোন করেছে জিজ্ঞেস করতেই বলে শহর থেকে জরুরী ফোন এসেছে বাজারের একজনের। সারাক্ষণ মোবাইল ফোন নিয়ে চলা ফেরাটা ময়মুনার চোখ এড়ায় না।

একদিন দোকানে বসে থাকতে মোবাইলে একটা মেসেজ পায় - "Do you love me of hate me?"। সুরাইয়ার সঙ্গে কথা বললেও এরকম একটি মেসেজ পেয়ে মামুনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। মেয়েরা প্রেম নিবেদন করবে এটা ভাল লাগে না। আবার কথাটা তার বলা হতো না। সুতরাং সুরাইয়ার মনের কথা জেনে আনন্দিত হয়। সে তাকে জিজ্ঞেস করতে চায় এই ভালবাসা কতটুকু। যদি মামুন রাজি হয় তবে কি হবে?

একমাস পর বর্ষা শুরু হয়। পথ ভেসে যায়। ভয়ঙ্কর বৃষ্টিতে ভিজে ফেরার সময় মামুনের টাইফয়েড বেঁধে গিয়েছিল। একসপ্তাহ বিছানায় থেকে আয়নায় দেখতে গিয়ে নিজের মুখকে অপরিচিত লাগে মামুনের। কাঁচা পাকা চুল দাঁড়ি। গলার আপেল ঝুলে যায়। দু'দিন পর সুরাইয়া আসবে দোকানে। এটা ভেবে নরসুন্দরের কাছে যাবে বলে ভাবে। অথচ দোকানে বসার মত শক্তি নেই। সকাল ১১টার দিকে তবুও সে দোকানে যায়। গিয়ে দেখে তখনো দোকান বন্ধ।

দোকানে খুলতে গিয়ে খুব দুর্বল মনে হয়। সে দোকানের সামনে দিয়ে ঝাঁপি খুলতে চায় না। পিছনের ছোট দরজা দিয়ে ভিতরের ছোটঘরে শুয়ে পড়ে। তারপর হঠাৎ ঘুমের ভেতর টের পায় বেড়ার ওপাশে দোকান খুলেছে, শহীদুল এসেছে। আর সে ঘুম ঘুম চোখে শুনতে পায় একটি পরিচিত নারী কণ্ঠ,
তুমি কাইল দোকানে আস নাই ক্যান?
থাকবার তো চাইসিলামই। মামুন ভাইজান গঞ্জে পাডাইলো। কি করুম।
আইজকা বুইড়াডা কই?
অসুখ হয়া পইড়া রইছে। মন হয় আরও ৩/৪ দিন আইতে পারব না।
ভালা হইছে। বেডা একটা বলদ। আমি হাসলেই ফ্যাক ফ্যাক কইরা চায়া থাকে । ভিমরতি ..হি হি।
তুমি আমারে কবে বিয়া করবা না, সুরেহা?
আহহারে, আমারে বিয়া করবার চায়। বামুন হয়া চান্দ ধরনের সখ! আগে যুগ্গতা বানাও
যুগ্গতা জানিনা, আমি দোকানের পয়সা দিয়া মোবাইল কিন্না দিলাম, দিসি না? আলতা সাবান কত কিছু যা লাগে দেই।
তয় কি সাবানের দাম দিয়া দিয়া সুরেহারে চাও? অত সস্তা না।
তুমি কারে বিয়া করবা? তাইলে?
আমি গেলাম, মমিন ভাইজান আমারে সোনার দুইডা চুড়ি দিসে। আগে এর চেয়ে ভালা কিছু দেও। পরে কথা।

..একটা খট খট শব্দের জুতো চলে যাওয়ার শব্দ হয়।

মামুনের জ্বর মুখে বিস্বাদ স্বাদটা বাড়ে । ভয়ঙ্কর একটা বৃষ্টি হলে হয়তো ভাল হত। ঘুম না ভাঙলেই আরও ভাল হতো।

****
সন্ধ্যায় শরীরটা ভাল অনুভব করে মামুন। বাড়ি আসে। পশ্চিমের দরজা খুলে খাটে বসে বাইরে মেঘ দেখছিল। লাল টকটকে সূর্য আড়াল হচ্ছে। পিছনে ফিরে লম্বা দীর্ঘ ছায়ায় মামুনের মনে হয় নিজকে বুঝতে গেলে আলোর চাইতে ছায়াই বড় উপকারী। ময়মুনা ফিরে আসে। থালা ভর্তি মুড়ি আর চিড়ে দিয়ে চলে যেতে চাইলে মামুন ডাকে।
বউ, একটু কাছে আস। এক গ্লাস পানি দিবা না।
কাসার বড় একটা গ্লাসে করে পানি দিয়ে চলে যাবার সময় ময়মুনার হাত ধরে। হাত ছাড়েন!
অত কাম কিয়ের একটু থাক
ময়মুনা ধপ করে পাশে বসে। কি কইবেন জলদি কন।

মামুন অপরাধটুকু স্বীকার করতে চাইছিল। তার দিকে অবহেলার কারণটা বলে হালকা হতে চাইছিল। এভাবে সময় নষ্ট করে দিতে ইচ্ছে হয় না।

সে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, কওনই লাগব? আমার লগে এমনি এমনি বওন যায় না?
Comments