গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ১

posted Apr 21, 2011, 12:12 AM by RA HAT   [ updated Apr 21, 2011, 12:14 AM ]
ওড়না দুলিয়ে খট খট শব্দে সুরাইয়া দোকানের ছাউনিতে ঢুকল। ফর্সা হাত, টুক টুকে লাল নখ, পায়ে খয়েরী ফিতার উঁচু স্যান্ডেল। ঢুকেই দোকানের কাচে হাত রেখে বলল, আচ্ছা, আপনের দোকানে কি জেসমিন কুমকুম আছে?

মেয়েটা এখানে এসেছে অনেকবার। দোকানটা মুখস্থ। মামুনও জানে ও কোন উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করবে না। ছটফট হাতে টা ওটা নেড়ে চেড়ে দেখবে। সিনেমার কবরীর ঢং এ গলা নেড়ে অযথা প্রশ্ন করবে,
চিত্রতরঙ্গ পত্রিকা আর আসে নাই, আপনার পোলাডা কেমন আছে ভাইজান? শহীদুল নাই যে, শরিল খারাপ?

মাথার উপরে সূর্য। বাজারটা ফাঁকা। পাশের দর্জির দোকান থেকে ফুটপ্যাডেলের ঘর ঘর শব্দ আসছে। মামুন রোজ শুক্রবারের মতো টালি খাতায় কর্মচারী শহীদুল্লাহর পয়সা চুরি মিলাতে ব্যস্ত ছিল। মাথার ঘন চুলে দু চারটে করে চুল পাকছে । বাড়িতে ময়মুনা সোহাগ করে সেই চুল তুলে জোয়ান করে দেয়। মামুন বিরক্ত হল কারণ তিতাস লজেন্সের তিন প্যাকেট গায়েব। এক ডজন মাগুর মাছের বড়শির ছিপের হিসাব পাওয়া গেল না। মায়ের অসুখের নামে ছেলেটা পয়সা নিয়েছে ক্যাশবাক্স থেকে । ওটা ফেরত দেয় নি। অনিয়ম চলতে থাকলে মামুনের সব চুল পেকে সাদা সেমাই হয়ে যাবে।

মামুন দোকানটা বইপত্রের দোকান থেকে ক্রমশ: মনোহারী দোকান হয়ে গেছে। গ্রামের বদলটা রাতা রাতি। ধানের ফলন বাড়ার পর টিনের ঘর উঠেছে। টিভিও এসেছে। সমিতির ঘরের পাশে তিনটা এনজিও ভাড়া উঠেছে। আসতে যেতে মটর সাইকেলের শব্দ হয়। দোকানে দাঁতের ব্রাশ, পেস্ট, ইণ্ডিয়ান সাবান, নারিকেল তেল, আলতা, লাভলী ক্রিম, টিউব মেহেদি এ সবের চাহিদা বেশী। বইপত্রের বিক্রি-বাট্টা নেই । নিউজপ্রিন্টের বাউণ্ডবুক জং ধরে নষ্ট হয়েছে। তবুও সে দোকানের এক তৃতীয়াংশ লাইব্রেরি করে রেখেছে। বইগুলো তার পছন্দের। অবসরে পরম যত্নে দৈর্ঘ্যপ্রস্থে সমান সমান করে তুলে রাখে। লুতফর রহমানের মহৎজীবন, ডেল কার্নেগীর প্রতিপত্তি বাড়ানোর বই, হাদিসের কাহিনী এসব বই কেউ না কিনলেও রাখে। ওমর আলি মাস্টার তার জন্মদাতা বাবার মত স্নেহশীল। তার জন্য লেখাপড়া, বিদ্যার মূল্য দিতেন খুব। নি:সন্তান বলে অপত্যস্নেহের সংঘর্ষ ছিল না। মৃত্যুকালে মাস্টার তার সামান্য সম্পত্তি লিখে দিয়ে বলেছিল, বাবারে ডিগ্রীটা পাস করে গেরামেই থাকিস। কথামত বিকমে ভর্তি হয়েছিল মামুন। শেষ আর হয় নি।

শীতের শেষে গরম নেমে গেছে। দোকানে গোল্লাছুট খেলার মতো এলোপাথাড়ি বাতাস ঢুকছে। ঘূর্ণি বাতাসে মেয়েলি সুগন্ধি মামুনের নাকে ঢুকল। ডান তর্জনীতে নাক ঘষে সে গন্ধটা এড়াতে চাইল। এসব খুব বাড়াবাড়ি মনে মনে বলল। দোকানে লোকজন নেই বলে কি তার ঘাড়ে অশরীর ভর করছে। তার মনে পড়ল বিবাহের প্রথম রাতে ময়মুনার শরীরে পাউডারের এমন একটা গন্ধ ছিল। পাটালিগুড়, চিড়ার মোয়ার কৌটার পাশে পাইনএপেল ক্রিমের প্যাকেট বসাতে গিয়ে সে দেখল মেয়েটা নায়ক নায়িকার ভিউ-কার্ড দেখছে। শরীর নুয়ে। চুল সরে মুক্তোর মতো ঘাড় ভেসে উঠেছে । সে মনে করল সুরাইয়া গত শুক্রবারও দুপুরে এসেছিল। তবে কি মেয়েটা তার সঙ্গে সময় কাটাতেই এখানে আসে?

মামুন নিজেকে দাঁত কামড়ে অন্যত্র মনোযোগ দিল। পুরনো ম্যাগাজিনে তাকে একটা পত্রিকা উল্টে ছবি দেখছে । একবার মনে হল সুরাইয়া এমন কিছু রূপবতী নয়। ক্রিম সাবান ঘষলে লক্ষ্মীপেঁচাকেও সুন্দর লাগে। আর একটা বয়সে সব মেয়েই সুন্দরী হয় । দেখতে দেখতে সাধারণ হয়ে যায়। যেমন তার স্ত্রী ময়মুনার একটা ছবি তার মানিব্যাগে। থানার স্টুডিওতে তোলা। ছবিটা এক সময় বহুবার দেখলেও মন ভরত না। এখন ঘামে জলে কাগজটা ময়মুনার মতই ঝাপসা হয়ে গেছে। সে ব্যস্ত বাচ্চা সামলাতে। আগের সেই টানও নেই। মামুনের দ্বিতীয় সত্তা বাচ্চা শিশুর মতো মিঠাইওয়ালার ঘণ্টা শুনতে পেল। হিসাবের খাতা ফুঁড়ে বায়স্কোপের রঙিন ছবি ভেসে উঠল। প্রথমে সে দেখল একটা স্বচ্ছ নদী, তাতে এক জোড়া চোখ শালুকের মতো ভেসে যাচ্ছে। তারপর গোলাপি ঠোঁট। ঠোঁটটা ঘাসের মতো মসৃণ, সদ্য লেপানো উঠানের মতো ভেজা। একটা বুনো ঘুঘু এস বসল, ঠোকরাতেই মেয়েটা আহ্লাদে ককিয়ে উঠল। মামুন বাস্তবে ফিরে ঘাম মুছে মুখ গম্ভীর করে গুনল - তিন নয় সাতাশ আর হাতে থাকল তিন।

সুরাইয়া ডাকছে । হাতের মুঠোবন্দী ঠোঁট ফাটা ক্রিমের দাম কুড়ি টাকা শুনে সে অবাক হল। মামুন পাকা ব্যবসায়ীর মতো দাম বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতেই সে অন্য কিছু আনতে ফেরত গেল। সুরাইয়ার বাবা সারের ব্যবসা করে হঠাৎ বড়লোক হয়েছে। মেয়েটার এখন স্কুল পাস করার কথা। খবর নেই। এই বয়সে এত ফুটানি করতে দেয়া ঠিক না। পরক্ষণেই সে যুক্তি পেল এসব বিষয় ওর বাপ মা যা ইচ্ছা করুক । তার কাজ জিনিস বিক্রি। মামুনের নিজস্ব যুক্তিগুলো সবই হেরে যাচ্ছে।

মেয়েটাও মনে হয় তার ভাবনাগুলো বুঝে ফেলছে। সে চোখে চোখ পড়তেই অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল, ভাইজান, একটা কথা বলি, মনে নিবেন না। আপনে কি খুব কপাটি খেলতেন?

মামুন এড়াতে যাবে এমন ভাবে বলল,
খেলে তো অনেকেই। কিন্তু এই কথা ক্যান?
এমনেই। হুনছি যারা কপাটি খেলে তারা আপনের মতন উচালম্বা হয়।

এইবার হাসল মামুন। এই সব আজব কথা কার মুখে শোনা?

মেয়েটা আর শুনল না। চারদিকে কেউ নেই দেখে নিচু গলায় বলল,
একটা কথা কই ভাইজান। কেউরে কইবেন না। আপ্নের দোকানের ফোনের নম্বর কত?

মামুন ঠিক বুঝতে পারলনা। সে ভাবল অনেকেই তার নম্বর নেয়। ঢাকা থেকে ফোন করলে সে মোবাইল রিসিভ করার জন্য পয়সা নেয়।

মেয়েটা যেন তার বিবাহিত স্ত্রী এমন আহ্লাদ করে তাড়া দেয়,
কই দিলেন না নম্বর।

তার নিরবতায় হি হি করে হেসে ফেলছে মেয়েটা। মামুন রসিকতা করার মত কেউ না। মেয়েটা কি তার দুর্বলতা টের পেয়েছে - মামুন শক্ত হতে চাইল।

ঠিক তখনই মামুনকে অবাক করে দিয়ে সুরাইয়া তার ঝুলানো কাল ব্যাগের বোতাম টস করে খুলে ফেলল । তারপর একটা নতুন মোবাইল বের করে খুব কাছে এসে বলল, ভাইজান, আমারে একটু দেখাইবেন এইডা দিয়া কেমনে ফোন করে?
Comments