বাংলা‎ > ‎

সাহিত্য

মানুষ আমার প্রিয় বিষয়। সাহিত্যে মানুষের জীবন যাত্রা, বৈষম্য, অভাব অনটন, ছোট ছোট আনন্দ বেদনাকে তুলে ধরতে ভাল লাগে।

গল্প: দ্বন্দ্ব সমাজ - ৬

posted Apr 21, 2011, 12:24 AM by RA HAT

এর পরদিন জমি বিক্রির চূড়ান্ত আলাপ হয়। এরপর বারেক, জব্বর আলি ও মামুন জরিনার খোঁজ নেবার জন্য থানা কমপ্লক্সে যায়। সবাই চাঁদা তুলে তাকে জেলা হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যভাবে পুরো অর্থের অর্ধেক দেয় বারেক। রবিবার বিকালে শহীদুলের বোনের উন্নতি ঘটে। সন্ধ্যায় সে কথা বলে। বারেক ও মামুন এক সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসে। ফেরার পথে বারেক বহুবিবাহের পক্ষে কথা বলতেই থাকে। মামুন বিরক্ত হয়। তবে সে ভুলে যায় না পরদিন সোমবার। থানা থেকে ফেরার সময় ফোন কার্ড কিনে আনতে ভুলে যায় না।

সোমবার সকালে বাজারে সালিশ হয়। তালুকদারের বাড়ির বিরুদ্ধে গ্রামের সবাই ক্ষিপ্ত হয়। কেউ কেউ জরিনাকে খারাপ মেয়ে বলে গ্রামছাড়া করতে বলে। বারেকের সঙ্গে তালুকদারদের পৈত্রিক বিবাদ থাকায়, সে তার বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেয়। গ্রামের মৌলানা স্বাক্ষী ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা নাজায়েজ ঘোষণা করে। শুক্রবার দিন বাদ জুম্মা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে এই বলে সবাই বাড়ি ফিরে আসে।

সোমবার দিন দুপুর গড়িয়ে গেলেও দোকান খালিই থাকে। মামুন পকেট থেকে ফোন কার্ডটাকে বের করতে থাকে আবার ঢোকায়। একসময় গোলাপী পোষাকে সুরাইয়া ঢোকে। সে হেসে বলে যে তার জমানো টাকাটা অন্যত্র খরচ হয়ে গেছে। আর জরুরী প্রয়োজনে চুলের শ্যাম্পু দরকার। সেটা সে বাকিতে নিতে চায়। সে দুদিন পর এসে পয়সা দিয়ে যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। মামুন সেদিনও সুরাইয়ার লাল জুতো দেখে। পায়ে নখে লাল নেলপালিশ দেখে মুগ্ধ হয়। তার চলা ফেরায় ছন্দে মাদকতা অনুভব করে। মামুন ফোনে কার্ড ভরে অনেক সময় নিয়ে বুঝিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সুরাইয়া অল্প সময় পরেই চলে যেতে চায়। তবে যাবার আগে বলে যায় তার দুটি বিবাহের প্রস্তাব সে ফিরিয়ে দিয়েছে। আর তার পছন্দ মামুনের মতো লম্বা সুদর্শন কাউকে। ফিরে যাবার সময় মামুনের কাজলে আঁকা বড় বড় চোখ তুলে চেয়ে থাকে দু বার এবং হেসে ফেলে।
মামুন যাবার আগে দোকানের মোবাইল নম্বরটা লিখে দেয় টালী খাতার পাতা ছিড়ে। মোবাইলটি দোকানে থাকে। কিন্তু এর পর মামুন বাড়িতে নিয়ে আসে সেটাকে।

আর পরদিন বিকালে মামুন সুরাইয়ার ফোন পায় এবং সুরাইয়া মোবাইল ব্যবহার শিখতে পেরেছে জেনে সুখী হয়। সে তাকে যখন প্রয়োজন ফোন করতে বলে। সুরাইয়া প্রতি সপ্তাহে নানান ছুতোয় দোকানে আসে। তেল, চুড়ি, স্নো, শ্যাম্পু যেটা লাগে বাকিতে নেয়। অন্য হিসাবের চেয়ে সুরাইয়া মামুনকে আলাদা দেখে।

একদিন রাতে তারা সবাই শুয়ে পড়েছে। শিশু কোলে ময়মুনা ঘুমিয়ে পড়েছে। এমন সময় মোবাইল ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে। মামুন দ্রুত দরজা খুলে মোবাইলে ফিস ফিস করে কথা বলে। সুরাইয়ার কার্ডে টাকা শেষ হয়ে যায়। ময়মুনা এত রাতে কে ফোন করেছে জিজ্ঞেস করতেই বলে শহর থেকে জরুরী ফোন এসেছে বাজারের একজনের। সারাক্ষণ মোবাইল ফোন নিয়ে চলা ফেরাটা ময়মুনার চোখ এড়ায় না।

একদিন দোকানে বসে থাকতে মোবাইলে একটা মেসেজ পায় - "Do you love me of hate me?"। সুরাইয়ার সঙ্গে কথা বললেও এরকম একটি মেসেজ পেয়ে মামুনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। মেয়েরা প্রেম নিবেদন করবে এটা ভাল লাগে না। আবার কথাটা তার বলা হতো না। সুতরাং সুরাইয়ার মনের কথা জেনে আনন্দিত হয়। সে তাকে জিজ্ঞেস করতে চায় এই ভালবাসা কতটুকু। যদি মামুন রাজি হয় তবে কি হবে?

একমাস পর বর্ষা শুরু হয়। পথ ভেসে যায়। ভয়ঙ্কর বৃষ্টিতে ভিজে ফেরার সময় মামুনের টাইফয়েড বেঁধে গিয়েছিল। একসপ্তাহ বিছানায় থেকে আয়নায় দেখতে গিয়ে নিজের মুখকে অপরিচিত লাগে মামুনের। কাঁচা পাকা চুল দাঁড়ি। গলার আপেল ঝুলে যায়। দু'দিন পর সুরাইয়া আসবে দোকানে। এটা ভেবে নরসুন্দরের কাছে যাবে বলে ভাবে। অথচ দোকানে বসার মত শক্তি নেই। সকাল ১১টার দিকে তবুও সে দোকানে যায়। গিয়ে দেখে তখনো দোকান বন্ধ।

দোকানে খুলতে গিয়ে খুব দুর্বল মনে হয়। সে দোকানের সামনে দিয়ে ঝাঁপি খুলতে চায় না। পিছনের ছোট দরজা দিয়ে ভিতরের ছোটঘরে শুয়ে পড়ে। তারপর হঠাৎ ঘুমের ভেতর টের পায় বেড়ার ওপাশে দোকান খুলেছে, শহীদুল এসেছে। আর সে ঘুম ঘুম চোখে শুনতে পায় একটি পরিচিত নারী কণ্ঠ,
তুমি কাইল দোকানে আস নাই ক্যান?
থাকবার তো চাইসিলামই। মামুন ভাইজান গঞ্জে পাডাইলো। কি করুম।
আইজকা বুইড়াডা কই?
অসুখ হয়া পইড়া রইছে। মন হয় আরও ৩/৪ দিন আইতে পারব না।
ভালা হইছে। বেডা একটা বলদ। আমি হাসলেই ফ্যাক ফ্যাক কইরা চায়া থাকে । ভিমরতি ..হি হি।
তুমি আমারে কবে বিয়া করবা না, সুরেহা?
আহহারে, আমারে বিয়া করবার চায়। বামুন হয়া চান্দ ধরনের সখ! আগে যুগ্গতা বানাও
যুগ্গতা জানিনা, আমি দোকানের পয়সা দিয়া মোবাইল কিন্না দিলাম, দিসি না? আলতা সাবান কত কিছু যা লাগে দেই।
তয় কি সাবানের দাম দিয়া দিয়া সুরেহারে চাও? অত সস্তা না।
তুমি কারে বিয়া করবা? তাইলে?
আমি গেলাম, মমিন ভাইজান আমারে সোনার দুইডা চুড়ি দিসে। আগে এর চেয়ে ভালা কিছু দেও। পরে কথা।

..একটা খট খট শব্দের জুতো চলে যাওয়ার শব্দ হয়।

মামুনের জ্বর মুখে বিস্বাদ স্বাদটা বাড়ে । ভয়ঙ্কর একটা বৃষ্টি হলে হয়তো ভাল হত। ঘুম না ভাঙলেই আরও ভাল হতো।

****
সন্ধ্যায় শরীরটা ভাল অনুভব করে মামুন। বাড়ি আসে। পশ্চিমের দরজা খুলে খাটে বসে বাইরে মেঘ দেখছিল। লাল টকটকে সূর্য আড়াল হচ্ছে। পিছনে ফিরে লম্বা দীর্ঘ ছায়ায় মামুনের মনে হয় নিজকে বুঝতে গেলে আলোর চাইতে ছায়াই বড় উপকারী। ময়মুনা ফিরে আসে। থালা ভর্তি মুড়ি আর চিড়ে দিয়ে চলে যেতে চাইলে মামুন ডাকে।
বউ, একটু কাছে আস। এক গ্লাস পানি দিবা না।
কাসার বড় একটা গ্লাসে করে পানি দিয়ে চলে যাবার সময় ময়মুনার হাত ধরে। হাত ছাড়েন!
অত কাম কিয়ের একটু থাক
ময়মুনা ধপ করে পাশে বসে। কি কইবেন জলদি কন।

মামুন অপরাধটুকু স্বীকার করতে চাইছিল। তার দিকে অবহেলার কারণটা বলে হালকা হতে চাইছিল। এভাবে সময় নষ্ট করে দিতে ইচ্ছে হয় না।

সে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, কওনই লাগব? আমার লগে এমনি এমনি বওন যায় না?

গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ৫

posted Apr 21, 2011, 12:23 AM by RA HAT

মুসুর কাশি হয়েছিল। ময়মুনা বাচ্চাটার ছোট পিঠে কুসুম গরম তেলে লং দিয়ে মালিশ করেছে। ফুলির মা মেয়েকে নিতে এসেছিল। বুদ্ধি দিয়ে গেছে । এখন বাচ্চাটা উপুর হয়ে ঘুমাচ্ছে।
মামুন ঘুমাতে গিয়ে ঝিম মেরে হয়ে শুয়ে আছে। ময়মুনা নিরবতা ভাঙে। কিছু হইছে? আপনের কি শইল খারাপ?
না
মাথা বিশ করে? টিপ্পা দিমু? সোহাগ করে বলল ময়মুনা। উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে না সে। হাতের চুড়ির রিনরিন শব্দ করে বাজে । মামুন কপালের ছাদে পরিচিত নারীহস্তের স্পর্শ অনুভব করে । সাবান খাওয়া মধ্যমা, তর্জনী। শিরিষ কাগজের মতো রুক্ষ্ম। হাতের তালু জমে যাওয়া বালিশের মতো শক্ত।

ময়মুনা কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু বলল না। স্বামীর মৌনতায় কষ্টের কিছু কিছু না বলাই ভাল । রাত অবশ্য তেমন বেশি না। শিয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। কয়েকটা ঝিঁঝিঁ পোকা পাল্লা দেয়। অচেনা নৈশ পাখি শীষ দিয়ে ডেকে উঠতেই ময়মুনা অধৈর্য হয়ে মুখ খুলল,
শহীদুলের লগে দেখা হইছে? হে আইছিল।
আবার আইছে? কোন সময়?
মগরিবের আজানের ঠিক আগে
ক্যান? শয়তানডা আবার কি চায়? দুধ কলা দিয়া গোখুর পালতাছি মন হয়। জানো হেয় কি করে। আমি যে বিস্কুট কিনি হেইডা দিয়া বারেক মিয়ার চায়ের দোকান লাভ করে। নিমক হারাম! মামুনের গলায় পাটা কাটানো বাটালির মতো আগুন চমকায়।
ময়মুনা দুঃসংবাদটা স্পষ্ট করে বলে,
শহীদুলের বইন জরিনার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। মন হয় বাঁচান যাইব না।
মামুনের বুঝতে পারল শহীদুল পয়সা বাগাতে একলা ঘুরে গেছে । সে বলল, শহীদুলরে পাচ পয়সার বিশ্বাস নাই। যেই পোলা হুদ্দর বইনের মরণের বাহানায় পয়সা তুলে আর বিড়ি টানে হে সবই পারে।
ময়মুনা বোঝাতে চেষ্টা করে,
নাগো মুসুর বাপ, ফুলির বাপ শুইনা আইছে। মাইয়াডা আসলেই খারাপ।
ফুলির বাপ!
হ। উনি দুপরে বিছুন ধান কিনতে থানার সিড স্টোর গেছিলো। অষুধের দোকানে শুইনা আসছে থানা হাসপাতালে জরিনা সারা রাইত খিঁচছে। এরপরে আর চেতন আসে নাই।
শহীদুলের মা বাড়িতে একলা। হে পাগলার মত কানতাসিল । আহহারে পোলাডা কেমনে এগুলান সামলায়।

জরিনার অসুখের নাম লয়া শহীদ মিছা কইতে গেল ক্যান? বাকের মিয়ারে কইছে ডাইবেটিস। আমারে কইছে সন্তান হইব। মামুন শহীদের আচরণটা ভুলতে পারে না।

শহীদুল মন হয় শরমে অসুখের নাম ঠিক কয় নাই। তার বইনের জামাই জরিনারে ফালায়া সউদি গেছে তিন বছর। গিয়া নিরুদ্দেশ। কেউ খবর দিসে মাটি কাটতে গিয়া মইরা গেছে। কেউ কইছে হে বিয়া করছে। এর ননদ শাউরী খারে দর্জাল। লাথ্থি দিয়া বাইর কইরা দিসে।
পরে?
মাইয়াডা হের বাদে নানান বাড়িত কাম করছে।
অত পেচাও ক্যান, ঘটনাডা আগে কও - অসহিষ্ণু হয়ে বলল মামুন।
তালুকদার বাড়িতে কাম করতে গিয়া সর্বনাশ হইছে । বাচ্চা পেডে মাইয়াডা চুপে চাপে করিমন বেওয়ার কাছে গেছিল ।
কি কও! এমুন কাম কেডা করছে? - কৌতুহলী হয় মামুন জিজ্ঞেস করে। ময়মুনা নিশ্চিত জানে না। সে বলল,
ফুলির মায় শুনছে সুরুজ তালুকদারের মাইঝলা পোলা মফিজ্যা। গুণ্ডামি করে, ইস্কুলের মাঠে রাইতে গাঞ্জা টানে। আবার কেউ কয় তালুকদার নিজেই..পোলার চেয়ে বাপের স্বভাব বেশি মন্দ।
.
জরিনা কি জানে না তালুকদার বাড়িডা কত্ত খারাপ? হে জাইনা শুইনা গেছে ক্যান? পয়লা বেশি পাওনের লোভে? তারপর পুরনো ক্ষোভটা তুলে বলল,
যেমন শহীদুল তেমন তার বইন!

এইডা কি কইলেন, প্রতিবাদ করে ময়মুনা। জরিনার দোষডাই দেখলেন? যে পুরুষডার এমুন করল হের দোষ নাই? মাইয়াডা সোজা সরল।
মামুন ক্ষেপে গিয়ে বলল, বেশি বুইঝো না। মাইয়াগো লাইগাই আদমেরা বিপথে গেছে।

ময়মুনার খারাপ লাগে। মামুনকে তার আর শিক্ষিত মন হয় না। সে মাঝে মাঝে জংলী পুরুষের মত কথা কয়।
শহীদরে কিছু দেওয়া হইছে? অখন কই?
ময়মুনা বলল, হ দিসি। আমার বিয়ার যে কানের দুল আছিল হেইডা শহীদরে দিসি।
আমগো যে সুময় খারাপ দিন গেছে জরিনারবাপ জুলহাস চাচায় কত কিছু দিসে। কবে যে কার দিন খারাপ হয় আল্লা ছাড়া কেউ জানে না।
দীর্ঘ সময় থেকে হারিকেনটা উজ্জ্বল মনে হয়। পৈত্রিক সুত্রে প্রাপ্ত কাঠের আলমারীর ছায়াটা আড়াআড়ি ভাবে পড়ে। বনের ভেতর টিঢঢি পাখির শব্দ হয়।
কেউ যেন বাড়ির আঙিনা দিয়ে চলে যায়।
দীর্ঘ নিরবতা ভেঙে ময়মুনা বলল, আপনে কাইল একটু জরিনারে দেইখা আসেন,
মামুন সায় দিল, আচ্ছা।

মামুন সকালে কোখাও যেতে পারবে না ।জমি বিক্রির কথা মধ্যে কথা প্রায় পাকা করে এসেছে। কাল সমিতিতে সব ঠিক ঠাক হলে বুধবার জমির বায়না করার জন্য "আশাবাদীর" অফিসে কমিটির তিনজনের থাকার কথা। ময়মুনা একসময় সমিতিতে সময় দিয়েছে। তাকে জানাবে বলেও জানাল না।

বারেকের বুদ্ধি হল জমিজমার হিসাবে মেয়েছেলেকে টানলে ভেজাল বাড়ে।

মামুন ঘুমানোর জন্য অন্যপিঠে ঘুরে শুয়ে থাকে । ময়মুনা অস্থির হয়ে ঘুমের ভেতর ডাকে, ঘুমাইছেন?
না, কও।
আপনে আমার হাতডা একটু ধরবেন। আমার খুব ডর লাগতাসে। ময়মুনার মনে হল তার স্বামী তাকে ফেলে নিরুদ্দেশ চলে যাবে!
মামুন অনিচ্ছুক হাতটা হাতে রাখতেই মেয়েটা স্বামীর বুকে মাথা গুঁজে হু হু করে কাঁদতে থাকে। বলে, আমি অসহায় মানুষ। জগৎ সংসারে বাপ নাই, বইন নাই, আপনে ছাড়া কেউ নাই। আমারে ফালায়া আপনে কোন জাগায় যাইবেন না।

গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ৪

posted Apr 21, 2011, 12:22 AM by RA HAT

ময়মুনা খাওয়ার পর শুয়ে ছিল। এমন সময় ফুল মতির টেনে টেনে কান্নার শব্দ শোনা গেল। কান্নাটা তার বাড়ির দিকে আসতে থাকে। দরজায় থামে। ময়মুনা ডাকে, কি হইছে রে ফুলি? মায়ে মারসে? কি করছিলি?
কিছু করি নাই। কুলসুমের লগে একটু পুস্কুনিতে ডুবাইছিলাম ।
আহহারে, আয় এদিকে। মেয়েটার চোখ টকটকে লাল। ময়মুনা হাত বাড়িয়ে ফুলির কপাল ছোঁয়।
জ্বর বান্দাইতাসস মন হয়। অকখনি বাড়িত যা ।
যামু না, আমি তোমার এইখানেই শুয়া থাকুম।
ঠিক আছে, শো।
কাঁথা পেড়ে দেয়। ফুলমতি বাধ্য মেয়ের মত শুয়ে পড়ে। বলে, আমার মা খারাপ। খালি মারে।
ময়মুনা সস্নেহে মেয়েটার ছোট কপালে হাত বুলায়। ভেজা চুলে বিলি কেটে দেয়। মেয়েটা আরাম পেয়ে চোখ বন্ধ করে আর বলে, মামী, তুমি যদি আমার মা হইতা ।মেয়েটার কথা শুনে ময়মুনা কপট রাগ করে, এই পটপটানি, আমি কি তোর মা না?
****
চৈত্র মাসে ময়মুনারও মায়ের কথা মনে পড়ে খুব । তার মা নিজের হাতে ফুল তোলা পাখা বানাতো। ছোট বেলায় সেও মাকে জড়িয়ে ঘুমাতো। একদিকে ঘুমাতো সে, অন্যদিকে ছোট বোন তাহমিনা। গরম পড়লে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে মার হাত ধপ করে পড়ে যেত । ময়মুনার সহজে ঘুম আসত না। প্রতিদিনই ছোট ছোট কষ্টের ঘটনা হত। জমে জমে সেটা শিশু মনকে বিষাক্ত করে দিত।

তাহুর কি একটা অসুখ হয়েছিল ছোট বেলায়, প্রায় রাতেই পেটের ব্যথায় কাঁদতো। মা থানকুনি বাসক পাতার রস দিয়ে কি একটা বানিয়ে দিয়েছিল। সাময়িক উপশম হত। একবার তিন দিন জ্বর আর বমি হলে তাকে আজানের সময় রিক্সায় করে থানা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঢুকতেই এক আয়া বাবাকে বলেছিল, আপনের ওই মাইয়াডাই বড়?
কোনডা?
ঐ যে পর্থমে ঢুকলো, ল্যাংড়ায়া ল্যাংড়ায়া হাঁটে যে। শেষ কথাটা মাটিতে পড়ার আগে ময়মুনার বাবা খেঁকিয়ে উঠেছিল, এই বেডি, মুখে আল্লা কি কোন আক্কল জ্ঞ্যানের পর্দা দেয় নাই?

ময়মুনার চোখে পানি আসার কথা। তার খোঁড়া পরিচয়টা সে জেনে গেছে। স্কুলের সহপাঠী থেকে মক্তবের হুজুর তাকে এই বিকলাঙ্গত্বের পরিচয়ে ডাকত। যারা ডাকেনি , তাদের একই কৌতুহল পায়ের আঙুল কেন নেই। হাটতে চলতে, পথ চলতে সবারই নজর তার অসমর্থ শরীরের দিকে।

তার বয়স যখন বার-তের বছর পনের মাইল দক্ষিণে অলকাকান্দা গ্রামে ফুফাতো বোনের বিয়ে খেতে গিয়েছিল । ফুফার অঢেল সম্পত্তি ছিল। কন্যার বিয়ে দিয়েছিল সিলেট টাউনে। শিক্ষিত পরিবারে। খুব সাজানো হয়েছিল বাড়িটা। মনে পড়ে সেই পক্ষের এক ছেলের কথা। লম্বা আর ভদ্র। খুব সুন্দর করে হেসে কথা বলেছিল। সে হয়তো জেনেছিল তার শরীরের কথা, কিন্তু একটিবারও এ বিষয়ে প্রশ্ন করে নি। শহরের ছেলেরা কি এত ভাল হয়? ভেবেছিল ময়মুনা।

তার দুদিন পর তাহু বোনের কাছে স্বীকার করে যে ছেলেটি তাকে ফুল দিয়ে চিঠি লেখার ঠিকানা দিয়েছিল। আর বলেছিল যাতে ময়মুনা না জানে। এটা শোনার পর ছেলেটির জন্য খুব ঘৃণা হয়েছিল।

অবশ্য কিছু সুখময় ঘটনাও সে দেখেছে। বর্ষার গাঙের মতো কষ্টের কাদা ধুয়ে দেয় সেই স্মৃতি ।

ময়মুনার বাবা বিকালে ঘরে ফিরলে দু'বোন ছুটে যেত । রাতও হয়ে যেত মাঝে সাঝে। কুপি বাতির আলোয় খাবারের আয়োজন হত। তাকে পাশে বসিয়ে তাহুকে কোলে নিয়ে ঠাণ্ডা সাদা ভাতে সালুন ঢালত বাবা । তাহুর গায়ের রং উজ্জল ফর্সা, চোখ গুলো মার্বেলের মতো স্বচ্ছ আর গভীর । তাহু বড় বোনের ভিষণ ভক্ত ছিল । ময়মুনা মোরগের শব্দের আগে জাগত। জেগে পা টিপে টিপে দরজার খিল খুলে বের হওয়ার সময় তাহুও জেগে উঠত। সে চোখ চোখ কচলে তাকে অনুসরণ করত। বলত, বুবু আমি যামু।
মুখে হাত চাপা দিয়ে ময়মুনা ফিস ফিস করে বলত, চুপ কর! মায়ে গলায় পাড়া দিব।
যত বড় হয়েছে মায়ের বিধি নিষেধ তত বেড়েছে। তবুও ঘরে মন থাকত না ময়মুনার। ভোরের আলোয় শিউলী আর বকুল ফুলের গাছে টিউটি পাখি ডাকে । গাছের নিচে শিউলী ফুল স্তুপ হয়ে আছে। জামা মুড়ে থলের মতো করে ফুল বোঝাই করে আনত। তারপর রঙিন সুতোয় মালা গেঁথে আয়নায় ঝুলিয়ে রাখতো।

স্মৃতিগুলো সাবানের ফেনায় রঙের মত প্যাচ খায়। কোনটি আগে কোনটি পরে মনে থাকে না। ময়মুনা মনে করতে পারে না সেই ঝড়ে রাতটিকে। আকাশ কি লাল হয়েছিল? বিকালে কি মা কিছু বলেছিল? তার বাবা কোথায় গিয়েছিল? অলকাকান্দা? তখন কি ময়মুনার ফুফা অসুস্থ ছিল? কত সন? পাশের বাড়ির সালমাদের টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে যায় কোন বার? বিজলী চমকালে চালের উপর দিয়ে আলো আসতো। জানালার কপাট চুয়ে ঘরে পানি কাদা হত। টিনের চালে শাখা আছড়ে পড়লে মনে হয় ভেঙে যাচ্ছে। মা দোয়াদরুদ পড়ে ফুঁ দেয় তাদের বুকে ।

তবে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া মায়মুনার জন্য সহজ ছিল না। কেননা সবচেয়ে কাছের স্কুলটাও দেড় মাইল দুরে। সপ্তাহে দু'দিন করে গিয়ে বাকিটা নিজে নিজেই পড়ত। কিন্তু পড়তে বসতেই মা চেঁচাত, মাইয়া মানুষের বিদ্যার দাম চাইর আনা । যা পেঁয়াজ রসুন কাট, চুলার ডাইলডা বাগাড় দে। তাহমিনার পড়তে চাইত না। সে যত বড় হল সাজগোজ বাড়ল । ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় থেকে তাহমিনার জন্য প্রস্তাব আশা শুরু হল। লোকে কথা ছড়াচ্ছে বলে একসময় দু'বোনেরই পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়া হল।

***
স্বামীর জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষায় থেকে সন্ধ্যায় সাইকেলের ঘন্টা শোনে ময়মুনা। স্বামী ঢুকেই খাবারের জন্য অস্থির হয়। মামুনকে খাওয়া শেষ করে রাতে শুয়ে হারিকেনটা কমিয়ে ময়মুনা জিজ্ঞেস করেছিল,
আইকা খাওন লইয়া অনেক বেইল পর্যন্ত বইসা আছিলাম। আইলেন না যে?
আমু কেমনে? তুমি জান না যে শহীদুল দোকানে নাই? দোকান ভর্তি মানুষ, দম ফালানির উপায় নাই । এর পরে আইজকাও মালামাল কিননের জন্য পাইকারের ঐখানে যাওন লাগছে। ময়মুনার মনে হয় মামুনের গলা কাঁপছিল। যেন সে কিছু লুকাতে চায়।

গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ৩

posted Apr 21, 2011, 12:21 AM by RA HAT

দলিল লেখক ফজলু মুন্সী দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় ছিল। ওমর মাস্টারের ভিটেতে আসতে আসতে বেলা পড়ে গেল। রিক্সায় মুন্সী বলল,
আপনে কি পুরা জমি বেচতে চান? হিসাবে আসে ২৮ শতাংশ। কিন্তু ইস্কুল রাখতে চাইলে একটু কম । গভমেন্টের আইনে ইস্কুল চালাইতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ জমি লাগে।

নি:সন্তান ওমর মাস্টারের মৃত্যুকালীন ইচ্ছায় টিনের বাড়িটা ভেঙে ইস্কুল ঘর উঠেছে । লম্বা দোচালা ঘর, ভিটেটা মাটির। গ্রামবাসী নিজেরাই জংলা থেকে বাঁশ কেটে দিয়েছে। একজন বিএ মাস্টারকে রাখা হয়েছে। হেডমাস্টারের দায়িত্ব পালন করে। ওমর মাস্টারের সখ ছিল গ্রামের সব শিশু সরগোলে পড়বে। মেয়েরাও পড়বে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার মৃত্যুর পর ছাত্র ছাত্রী তেমন একটা বাড়ে নি।

মুন্সী ফিতা নিয়ে স্কুলের বাউন্ডারীতে টেনে ধরল। বলল, খতিয়ানের মাপে .. মোট জমি ৫৯ শতাংশ। কিন্তু আরএস পর্চায় ৫৮.৫।
জমির একটা ভাল পার্টি আছে। এরা দুই সপ্তাহের মধ্যে বড় জমি কিনতে চায়
কারা?
আছে! রহস্যটা লুকিয়ে মুন্সী মাথা ঝাঁকায়। "আশাবাদী" এনজিওর সেক্রেটারীর সাথে বাদ জুম্মা কথা হইছে । জাগাডা এগোর বিশেষ পছন্দের। এনজিও তো। পয়সা আছে। তিন তলা দালান তুলব। বিদেশী মানুষেরা থাকনের আলদা ঘর তুলব।
কত দিব?
চাইর লাখ
চাইর লাখ! অঙ্কটা শুনে মামুন ঝাঁকি খায়।
হ! তয় একডা শর্ত, পুরা জমি চায়। ইস্কুলের ঘর সুদ্ধা কিনতে চায়।
না, ইস্কুল বেচন যাইব না, মামুন শক্ত গলায় প্রতিবাদ করে।
বেচলে ইস্কুলেরই লাভ। এরা নামকরা এনজিও। খালি ইস্কুলডার নাম ওমর আলি প্রাথমিক বিদ্যালয় বদলায়ে আশাবাদী শিশু বিদ্যালয় করব। সব এনজিও ইস্কুল দেখায়। দেখাইলে তাগো সুবিধা। বানানো পোলার বাপ হইবার চায় - মুন্সী হাসল। যেন খুব হাসির কিছু বলে ফেলেছে।

তারপর অভয় দিয়ে বলল, ফরিদুল চাচা, জব্বর মেম্বর, বারেক মিয়া এগো লগে কথা হইছে। সমিতি বেচতে উনাগো আপত্তি নাই।

বারেকও কইছে? বারেক সোজা কথার মানুষ। সে সমিতির পুরনো ও সক্রিয় সদস্য।
জ্বি উনিই কইলেন যে টেকাপয়সার ন্যায্য ভাগ পাইলে তার অসুবিধা নাই। আপনে রাজি থাকলে হয়। দলিলে মানা নাই।

মুন্সী চশমাটা সেটে দলিলের শর্তাবলীতে আঙুল দেখায়।
"...দ্বিতীয় পক্ষ জনাব আবদুল মামুন জমির জনাব প্রথম পক্ষ ওমর আলির অবর্তমানে দক্ষিণ প্রান্ত ভোগ দখল করিতে পারিবে। বাকি অর্ধেক সম্পত্তি গ্রামের উন্নতির প্রয়োজনে বিদ্যালয় তথা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত থাকিবে। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবার জন্যনিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী উপদেষ্ঠা কমিটি গ্রহণ করা হইল। তবে যেকোন প্রকার বিবেচনায় দ্বিতীয় পক্ষ আবদুল মামুনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হইবে।"

দেখছেন দলিলের প্যাচ । আপনি বলবেন গেরামের উন্নতির প্রযোজনে ইস্কুল এনজিও হাতে হস্তান্তর করতেছেন। বাকিডা গঞ্জের উকিল দিয়া লেখায়া লমুনে।

মামুনের কাছে স্কুল বিক্রি অবিশ্বাস্য মনে হয়। সে দেখতে পায় বেঞ্চে সমস্বরে শিশুরা নামতা পড়ছে। ব্ল্যাক বোর্ডে কিছু লিখে প্রশ্ন করতেই হাত তুলছে কয়েকজন। তারপর ঘন্টা শুনে শিশুরা চিৎকার করে বের হয়ে আসছে। সেই শিশুদের চিৎকার এক বাণ্ডিল নোটের কাছে বিক্রি করবে সে। অসম্ভব। ঠিক পরমূহুর্তে মনে হল এনজি যদি স্কুলের ও সমিতির দায়িত্ব নেয় তাহলে উপকারই হবে।

*****
শনিবার-রবি-মঙ্গল-বুধ শহীদুল দোকান দেখে। শহীদুল ময়মুনার দুর সম্পর্কের ভাই। উনিশ বছরের চটপট ছেলে, বিক্রি বাট্টা করার কায়দা জানে। পুরা দোকানের হিসাবনিকাশ মুখে মুখে করতে পারে। দোকানের দুটো চাবির একটা মামুন অন্যটা শহীদুলের কাছে থাকে।

শনিবার সকালে অবসরের সুযোগে ঝড়ে ভেঙে পড়া গোয়াল ঘরটা সারাচ্ছিল মামুন। ফুলমতি জেগেছে ভোরে। সে মামুনের ন্যাওটা। মামার দক্ষতা মনযোগে দাড়িয়ে দেখছে এবং নানা প্রশ্ন করছে। ধারালো দা দিয়ে বাঁশ চিড়ে বেতি বানাচ্ছে দু'জন কামলা। মামুন পাটের আঁশ জোড়া দিয়ে দড়ি পাকাতে গিয়ে মাঝে মাঝেই ফুলমতির সাহায্য নিচ্ছিল।

ঠিক সে সময় হন্ত দন্ত হয়ে শহীদুল এসে বলল, ভাইজান, দু:সংবাদ। দীতপুরে মেজ আপার বাচ্চা অইতে রক্ত গেছে খুব। অখন থানা কমপ্লেক্সে। বাচন মরণ আল্লার হাতে।
শহীদ উদ্বিগ্ন হয়। অমানবিক তবুও জিজ্ঞেস করে, দোকানে যাইতে পারবি না?
না
মামুন পকেট হাতড়ে পঞ্চাশ টাকার নোট ধরিয়ে বলে,
যা, আমিই দোকান দেখুন নে।

শহীদ টাকাটি পকেটে গুঁজে মিলিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঘোমটা ঠিক করে ময়মুনা বের হয়ে আসে। কার লগে কথা কন? নাস্তা খাইবেন না?
কার লগে আবার তোমার তালতো ভাইয়ের লগে। হের মেজ বইনের শইল খারাপ। বাচ্চা অওনের সমু রক্ত গেছে। অখন আমারে দোকান খুলন লাগব
জরিনার বাচ্চা হইব? কী কন। জরিনার জামাই তো কুয়েত থাকে আড়াই বছর।
মাঝখানে আসতেও পারে - তুমি তো ঘরে থাক। জানবা কেমনে। মামুন খেপে যায়। হন হন করে বাড়িতে ঢুকে হ্যাচকা টানে ময়লা জামা নামিয়ে বাইরে আসে।
কই যান? হুনেন, কিছু মুখে দিয়া বাইরন - ময়মুনা পিছন পিছন আসে।
পথ ছাড়ো। শহীদুলরে খালি সামনে পাই আগে। কি বাড় টা বাড়ছে বইন লয়া তামসা করে। এরে জবাই করুম আইজ।
একটু হুনেন। ময়মুনা থামাতে চায়। আমারও তো ভুল অইতে পারে। শহিদ এরুম মিছা কথা কওনের কথা না।

***
মামুন সাইকেলটা সড়কে তুলল। আধা মাইল দুরে মূল সড়ক থেকে বাম দিকে সরু রাস্তায় নেমে গেল । তোষা পাটের চারা বড় হচ্ছে । পাতায় পাকা লিচুর মত হালকা লাল রং । হাফেজের মক্তব শুরু হয়েছে। আইল দিয়ে আমপারা বুকে চেপে কয়েকটা শিশুরা সে দিকে হেটে যাচ্ছে।

মক্তব ঘর সংলগ্ন জামগাছের নিছে হাতুড়ি দিয়ে মাদক বিরোধী টিনের সাইনবোর্ড লাগাচ্ছিল হাফেজের দ্বিতীয় পক্ষের ছোট ছেলে । শহীদের সমবয়সী। ঘাড় ঘুরিয়ে মামুনকে দেখে সচকিতে বিড়িটা লুকিয়ে ফেলে সে।
মামুন সাইকেল থেকে নামে না। বাম পা মাটিতে রেখে বলে,
ওই বুলবুল শহীদুলরে দেখসস?
না স্যার, হের নাকি বইনের অসুখ - ছেলেটা হয়তো বিড়ির কারনে হতস্তত: হয়
আসে নাই তো অসুখ জানসস কেমনে?
আব্বার কাছে পানি ফুঁ নিতে আইছিল হের চাচী

***
দোকান বসে মামুন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল স্কুল সহ জমিটা বিক্রি করে দেবে। পাইকারী মালামালের কিনতে গিয়ে প্রায়ই বাকি রাখতে হয় । একই রকম দোকান উঠেছে আরও দুটো। গ্রামে বিদ্যুত আসবে। মোবাইলের ব্যবসাও বাড়বে। একটা কাচের দরজা লাগাতে হবে, বড় দোকান লাগবে। আলমারী লাগবে। মামুন সিগেরেট পান রাখে না। বারেক দোকান সিগেরেট বেচে ভাল ব্যবসা করে। মামুনের মনে হল তার দোকানে সিগেরেট না বেচাতে ধুমপান কিছু একটা কমছে না। তাহলে বিক্রি করলে অসুবিধা কি?

বারেক ছোট খাট শক্ত লোক। সম বয়সী হলেও কথায় পাকা। সিদ্ধান্ত নেয় দ্রুত। সমিতিতে টাকা পয়সা উঠাতে সমস্যা হলে বারেক সেটার সমাধান করে। জমি বিক্রিটা নিশ্চিত করতে ঘণ্টা খানেক পর দোকানে বিশ্বস্ত এক চাচাকে বসিয়ে মামুন বারেকের দোকানে গেল।

মালয়েশিয়ায় আড়াই বছর কাজ করে শ্রমিক ছাটাই করার সময় বারেক দেশে ফিরে আসে। বিদেশে থেকে তার চলাফেরা বদলেছে। দোকানটা ছোট হলেও রং করেছে। বিকাল থেকে চা বিক্রি করে। টুইনওয়ানে হিন্দী গান বাজায় চড়া শব্দে । ফলে জমজমাট থাকে। লোকজন আড্ডায় বসলে উঠতে চায় না।
কি খবর তোর?
খবর নাই দোস্ত, মামুন বলল। মরণেরও উপায় নাই। খাঁজ তেলের দাম বাড়ায়া দিছে ময়জুদ্দির কুলু। সমিতির রাইসমিলটা নষ্ট। যাই হউক, মুন্সীর পুত তোরে কিছু কইছে।
হ, কইছে - বারেক ব্যাপারটা জানে।
তর কি মত, ইস্কুলডা বেচন কি ঠিক হইব।
এই ভাঙ্গা ইস্কুল থাইকা কি লাভ? - বারেক সোজাসুজি বলে ফেলল। দেড় মাইল দুরেই আরেকটা ইস্কুল উঠছে। আর হুনছি ছোট তালুকদার তার জমিতেও ইস্কুল খুলবো, দালান উঠব।
মাস্টার কাকার লগে এইডা বেঈমানী। আমার তো কিছু নাই। উনি খাওয়াইছে বইলা খাইছি। পড়ছি। আর মরনের সময় বিশ্বাস কইরা জমি দিছে আমার নামে।
বারেক হা করে বলে, বেঈমানী ভাবলে বেঈমানী। না ভাবলে না। মাস্টর যখন ইস্কুল খুলছিল হে কি মরা বাপেরে গিয়া জিগাইছিলো? দুনিয়া দমের খেলা। যে মারা যায় তার আবার ইচ্ছা অনিচ্ছা কি?

সহজ সত্যটা মামুন বুঝতে পারছে না বলে। দোকানের ভিতর থেকে বের হয়ে মামুনের পাশে বসল বারেক। বলল, ইস্কুল কমিটি বিষয় না।
পয়সা পাইলে বেবাক ঠিক। চাইর লাখের অর্ধেক তুই ল, বাকিডা জুলমত, ফরিদুল, আমারে মিলমিশ কইরা দে আমরা সামলায়ে দিমু।

মামুন চুপ করে ভাবছিল যদি স্কুলটা নষ্ট হয়। যদি ছাত্র ছাত্রী গ্রামবাসী ক্ষেপে যায়। আর ওমর মাস্টারের নামটা বদলাতে দেয়া ঠিক হবে না।

বারেক তাড়া দেয়, কি ভাবস? বেশী ভালা ভালা না। হো হো করে হাসল সে। আমারে দেখ যে মানুস চিন্তাই করে না হে যাত্রা দেখে, বাইজি নিয়া ফুর্তি করে, আর যে বেশী বুঝে সে পায় টেমা বউ।
"টেমা বউ" শব্দ দিয়ে ময়মুনাকে আহত করার চেষ্টাটা বরইয়ের কাঁটার মত বুঝে বিঁধে। মামুন খেপে বলে,
কি কইসস? আরেক বার ক। মাগীবাজ কোন জায়গার।
মামুনকে খেপতে দেখে উল্টো ঠাণ্ডা হয়ে যায় বারেক। আঙুল দিয়ে দাঁতে লেগে থাকা পান পরিষ্কার করে সে বলে,
আরে দোস্ত গোস্বা হইলে কেমন হয়। একটু তামসাও কি করন যাইব না। আমি আসলেই একটা হারামী। খবর আছে। এইবার তিন নম্বর আনতাছি

তিন তম্বর! বিস্মিত হয় মামুন। এগুলান কি? বিয়া কি গাছের গোটা? মাইয়ারা কি মানুষ না?

বারেক তার মতো ব্যাখ্যা করে, মাইয়া মানুষ সংসারের খুঁটি। এক খুঁটি দিয়া কি ঘর হয়? না।
হয় ছাত্তি । একটু বাতাস আইলেই উড়ায়ে লয়া যায়। চাইরদিকে পানি ঢুকে। এর লাইগাই কুরান মজিদের নির্দেশ মুমিনের চাইরটা বিবি ।
মামুন আজব যুক্তিতে হেসে উঠল। বলল,
তুই বাড়িতে দশটা খুটি বসা, আমার শইল ভালা না। আমি উঠলাম
নতুন পানির চা ফুটেছে। চিনি বেশী করে দুধের চা এগিয়ে বলে,
আরে ব, চাডা খায়া গেলে কি হয়। গরীবের বুদ্ধি দেরিতে ফলে।
আস্তে আস্তে বারেক বলতে থাকল দুইডা কাম কর।
এক জমিটা বেইচা নতুন ঘর তোল। আরেকডা বিয়া কর। দুধে আলতা মাইয়া আছে. অল্প বয়স, ভারী শইল - দেখলে তোর পছন্দ হইবই। বৈকালে ল যাই। আরে জিনিস দেখলেই কি কিনন লাগব,
দেখতে কি মুশকিল?

মামুনের মনে হয় খিদে পেয়েছিল। অস্বস্থিতে সুরুৎ সুরুৎ করে চা খায়। বারেকের কথাগুলো তত খারাপ লাগে না। কিন্তু তার বউকে নিয়ে ভাবে।

আবার কি চিন্তা করস? ভাবীজানে চোখের পানি? ঘরে সতীন তুলতে দিব না? হেইডা সামলানির বুদ্ধি আছে। মনে রাখিস লোহা লাল থাকলে কামারে পিটায়, আর যোয়ানি থাকতে মর্দে বিয়া করে।

আকাশে একটুকরো মেঘ ভেসে যাচ্ছে। বাজারের উপর দিয়ে কেউ যেন একটু ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। সুন্দর ঘুড়িটা বার বার ছিঁড়ে যেতে চায়।
বারেকের কথাগুলো আজব। চা শেষ হয়। বিস্কুটের স্বাদটা মামুনের খুব চেনা লাগে।এই বিস্কুট পাইলি কই? এডি তো বর্ডারের থন আনাইছিলাম আমি? আরও আছে। চস্কামস্কার প্যাকেট দেখালো বারেক।
এডি তোর দোকানেরই। শহীদুল দিয়া গেছে। কইল অর্ধেক পয়সা দিলে চলব।
শহীদ! কবে? গতকালও বিস্কুট চিপসের হিসাব মিলে নাই।
হে তো মাঝে মইধ্যে আসে।
আগেও এগুলান দিসে? - মামুন তার দোকানের চুরির বিষয়টা বুঝতে চায়।
ক্যান?
পোলাডা খুব ভালা। কথা মত চলে। সেলাম কায়দা জানে।

বারেকের মনে যে শহীদুলের জন্য আলগা স্নেহ তা মামুনের বুঝতে বাকি থাকে না।

গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ২

posted Apr 21, 2011, 12:17 AM by RA HAT

কোলের ছেলেটা ঘুম থেকে উঠেই কেঁদে উঠবে, সেজন্য বাড়ির সামনের পুকুরে কাকের মতো ডুব দিল ময়মুনা । ঘাটে পূবপাড়ার হরিদাসী আর ফিরু কাপড় কাঁচছে। ফেনা দুলে আসছে তার দিকে। শাড়ীর ভেতর সাবান সহ হাতটা চালান করে দিয়ে শরীর ডলে নেয়। নুয়ে পড়া ডালে একটা মাছরাঙা। পুকুর পারে জোড়া আম গাছের একটাতে টক আম, অন্যটা সিন্দুরে মিঠা। হলুদ মঞ্জরীতে মাছি উড়ছে ।

স্নান শেষ হয়ে গেল। লেপ্টে থাকা শাড়ীতে পা টেনে বাড়িতে ঢুকে সতর্ক চোখে চারদিকে দেখে নিল সে। উঠানে লাল কুকুরটা ভিভ বের করে তাকিয়ে আছে। ভেজা আঁচলটা ঝট করে পিঠ থেকে সরিয়ে নিল। বাচ্চা হওয়ার পর গাঁয়ের মেয়েদের লজ্জা কমে যায়। অনাবৃত অংশ রোদ পোহায়, ভিজা শরীরে ঝির ঝির বাতাস বয়। সারাক্ষণ খোলা রাখতে মন চায় ময়মুনার। ভাবে পুরুষ মানুষের কত আরাম । গুনগুন গান গান করতে করতে ভেজা আঁচল দড়ির মতো চিপে ধনুকের ছিলার মতো চটাস চটাস শব্দে চুল ঝাড়ে । পর পর দুটো বাচ্চা মারা গেছে ময়মুনার। মুস্তাক হওয়ার পর থেকে হাটতে চলতে শরীর ঝাঁকি খায়। লাবন্য নষ্ট হয়েছে। কোমর পর্যন্ত চুল ছিল এখন এক বিঘতে ঠেকেছে।

মুসু তখনও ঘুমাচ্ছে । ছোট ঘরের মাটিতে রাখা সিলভারের ডেকচিতে কৈ মাছ দিয়ে পালং শাকের ঝোল। মাটির ঢাকনা খুলতেই গরম ভাতের ভাপ উড়ে আসে নাকে। কেউ একজন ঢুকল দরজা দিয়ে। পায়ের চপল শব্দ চিনতে ভুল হয় না। কেডা ফুলমতি?
মেয়েটা বলল, হ মামী। মামা নাই?
না, মন হয় আইব না। কই জেন যাইব।
তয় কি মামারেই খালি লাগে, আমারে না?
মেয়েটি ভুল ভাঙাতে কাছে আসে। বিড়ালের মতো কাছে এসে ঘুর ঘুর করে যাতে মামীর তার ভুল ভাঙে। মাটির দেয়ালে ঝোলানো পুরনো ছবিটা দেখিয়ে বলে
মামী, আপনে কত সুন্দর আছিলেন আগে।
অখন নাই? - হাসে ময়মুনা
না - ফুলমতি বেফাস সত্যি বলে ফেলে। মিথ্যে বলা রপ্ত হয় নি তার। ময়মুনা ছল অভিমান দেখাতে বলে,
তাইলে তোর মামারে একটা নতুন মামী আনতে কই। কমু?
না, না, মেয়েটা বিব্রত হয়ে ছুটে আসে। সমাধানটা ভাল না
ময়মুনা জানে ফুলমতি কখনোই এমন প্রস্তাবে রাজী হবে না। এমনকি ময়মুনার বিকলাঙ্গ পায়ের কথা শুনেও না। অন্যরা অক্ষমতাকে গ্রহণ না করলেও ফুলমতি করেছিল। সে শুধু প্রশ্ন করেছিল, মামী কেমনে হইছে এমুন?

******
ময়মুনা নিরব থাকে। উত্তরটা ময়মুনার জানা নেই। এটা জন্মগত সমস্যা। হয়তো কোন অভিশাপে আল্লাহ তাকে আঙুলগুলো দেয় নি। জন্ম থেকেই সে জানে সে এমন। মা বলতো দেওয়ের বাতাস লেগেছিল। সে দৈনন্দিন কাজ করে, খুঁড়িয়ে চলে, আর কাপড়ে ঢেকে অক্ষমতা ভুলে থাকতে চায়।

ময়মুনা দেখল ফুলমতি চলে যাচ্ছে। আমি গেলাম।
খাড়া একটু
একটা বাটিতে কইমাছের ঝোল দিয়ে ঢেকে ফুলমতির হাতে দিল। নে তোর মায়েরে দিস। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল, আর তখুনি শিশুপুত্র মুস্তাক তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।


******
মেয়েটা এত টাকা পায় কোথায়? মামুন মোবাইলটা ঘুরে ফিরে দেখছিল। মেয়েটা তাকে রেখে পিছনে গেল। হাতে করে নিয়ে কেয়া সাবান নিয়ে আসল।
আপনে কি মমিন ভাইজানরে চিনতেন?
মমিন! - মামুন বিস্মিত হয়।
ও, তাইলে চিনেন না । বখুরার সৈয়দ বাড়ির সন্তান। হুনছি মমিন ভাইজানগো ঢাকায়ও তিনডা বাড়ি আছে। আমগো সমিতির ইলেকশনে আইছিল। দেখছেন মন হয়।
হু - মামুন ফোনটা চেপে চার্জ দেখতে থাকে
মোবাইল কি মমিনের? মমিন দিসে?
কি যে কন আপনে। দিলেই কি আমি নিমু?
জানেন ভাইজানরে আম্মায় খুব ভালা পায়। আমার জন্য প্রস্তাব আনছে। মানুষ খারাপ না কিন্তু ..
কিন্তু কি - মামুন বিস্মিত হয়।
উনারে আমি বিবাহ করুম না। ইসসিরে মুখ ভরতি কালা বরোন । আমি কই, এই যে আপনেরা আপনেগো ইস্কিন কত ভালা।
মামুন অবশ্য জানে সব মানুষই দাগহীন মুখ পছন্দ করে। সুরাইয়া তাকে মনযোগ দিয়ে দেখেছে ভেবে সে একটু গর্বিত হয়।

মেয়েটা ততক্ষণে একটা উপটানের প্যাকেট নিয়ে বলল, ভাইজান এইডা নিলাম। লেইখা রাখেন। পরে টেকা দিমুনে।
মামুন বাধা দেয়। না, না, বাকি দেওন সম্ভব না।
ক্যান, আমারে বিশ্বাস হয় না? মেয়েটা ছল করে। খলিফা কাকারে জিগান, উনি জামার মাপ নিসে। সোমবার কামিজ নিতে আমু তো।
তয় সেইদিন এগুলান নিলেই হয় হয় না?
ভাইজান! আপনে যে কি। বইখাতা ছাড়া যেন কিচ্ছু বুঝেন না -- গদ গদ গলায় সুরাইয়া ভেঙে পড়ে, কাজল চোখে সরাসরি চায়।

সে কি বোঝাতে চায় মামুনের স্পষ্ট হয়ে যায়। সুরাইয়া বলে,
আমি এইখানে আইলেই আপনের খোঁজ নিতে আসি। দুকানে তো আপনে থাকেনই না। সমিতির কেলাসও লন না।

মৌনতায় সম্মতি পেয়ে সুরাইয়া উপটানের প্যাকেটটা তার ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে।
নেন, এই দুইডাও খাতায় লেইখা রাখেন। মামুন বাধ্য ছাত্রের মতো লিখল, সাবান ১টা, ঠোটপালিশ ১টা।
সোমবার বৈকালে আসুম। থাকবেন না?
মেয়েটা মনে হয় জানে বিকালে দোকান নির্জন থাকে।
থাকমু। আর আমি না থাকলে শহীদরে দিয়া গেলেও চলব।
না, আপনেই থাকবেন। আরেকটা কারণে দরকার আপনেরে। বলেই ঠোঁট চেপে রহস্যময় একটা হাসি হাসল।
এইডাও নিলাম। বলে চিপসের একটা প্যাকেট তুলে নেয়।
হাল ছেড়ে দেয় মামুন। ফোনটা ফেরত দেয়। বলে, মোবাইলে চার্জ আছে। মিনিট নাই। সোমবার দিনআমি কার্ড আনায়া রাখুম। তখন দেখায়া দিমু।

সুরাইয়া বিদায় নিয়ে নেমে যায়। সম্বিত ফিরে পেয়ে দ্রুত ক্যাশবাক্সে ভাল করে তালা দেয়। তারপর দোকানের ভিতরের ছোট ঘরের
খাটের নিচে রাখা লোহার ট্রাঙ্কে বাক্সটা ঢুকিয়ে দোকান বন্ধ করে দেয়।
(চলবে)

গল্প: দ্বন্দ্ব সমাস - ১

posted Apr 21, 2011, 12:12 AM by RA HAT   [ updated Apr 21, 2011, 12:14 AM ]

ওড়না দুলিয়ে খট খট শব্দে সুরাইয়া দোকানের ছাউনিতে ঢুকল। ফর্সা হাত, টুক টুকে লাল নখ, পায়ে খয়েরী ফিতার উঁচু স্যান্ডেল। ঢুকেই দোকানের কাচে হাত রেখে বলল, আচ্ছা, আপনের দোকানে কি জেসমিন কুমকুম আছে?

মেয়েটা এখানে এসেছে অনেকবার। দোকানটা মুখস্থ। মামুনও জানে ও কোন উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করবে না। ছটফট হাতে টা ওটা নেড়ে চেড়ে দেখবে। সিনেমার কবরীর ঢং এ গলা নেড়ে অযথা প্রশ্ন করবে,
চিত্রতরঙ্গ পত্রিকা আর আসে নাই, আপনার পোলাডা কেমন আছে ভাইজান? শহীদুল নাই যে, শরিল খারাপ?

মাথার উপরে সূর্য। বাজারটা ফাঁকা। পাশের দর্জির দোকান থেকে ফুটপ্যাডেলের ঘর ঘর শব্দ আসছে। মামুন রোজ শুক্রবারের মতো টালি খাতায় কর্মচারী শহীদুল্লাহর পয়সা চুরি মিলাতে ব্যস্ত ছিল। মাথার ঘন চুলে দু চারটে করে চুল পাকছে । বাড়িতে ময়মুনা সোহাগ করে সেই চুল তুলে জোয়ান করে দেয়। মামুন বিরক্ত হল কারণ তিতাস লজেন্সের তিন প্যাকেট গায়েব। এক ডজন মাগুর মাছের বড়শির ছিপের হিসাব পাওয়া গেল না। মায়ের অসুখের নামে ছেলেটা পয়সা নিয়েছে ক্যাশবাক্স থেকে । ওটা ফেরত দেয় নি। অনিয়ম চলতে থাকলে মামুনের সব চুল পেকে সাদা সেমাই হয়ে যাবে।

মামুন দোকানটা বইপত্রের দোকান থেকে ক্রমশ: মনোহারী দোকান হয়ে গেছে। গ্রামের বদলটা রাতা রাতি। ধানের ফলন বাড়ার পর টিনের ঘর উঠেছে। টিভিও এসেছে। সমিতির ঘরের পাশে তিনটা এনজিও ভাড়া উঠেছে। আসতে যেতে মটর সাইকেলের শব্দ হয়। দোকানে দাঁতের ব্রাশ, পেস্ট, ইণ্ডিয়ান সাবান, নারিকেল তেল, আলতা, লাভলী ক্রিম, টিউব মেহেদি এ সবের চাহিদা বেশী। বইপত্রের বিক্রি-বাট্টা নেই । নিউজপ্রিন্টের বাউণ্ডবুক জং ধরে নষ্ট হয়েছে। তবুও সে দোকানের এক তৃতীয়াংশ লাইব্রেরি করে রেখেছে। বইগুলো তার পছন্দের। অবসরে পরম যত্নে দৈর্ঘ্যপ্রস্থে সমান সমান করে তুলে রাখে। লুতফর রহমানের মহৎজীবন, ডেল কার্নেগীর প্রতিপত্তি বাড়ানোর বই, হাদিসের কাহিনী এসব বই কেউ না কিনলেও রাখে। ওমর আলি মাস্টার তার জন্মদাতা বাবার মত স্নেহশীল। তার জন্য লেখাপড়া, বিদ্যার মূল্য দিতেন খুব। নি:সন্তান বলে অপত্যস্নেহের সংঘর্ষ ছিল না। মৃত্যুকালে মাস্টার তার সামান্য সম্পত্তি লিখে দিয়ে বলেছিল, বাবারে ডিগ্রীটা পাস করে গেরামেই থাকিস। কথামত বিকমে ভর্তি হয়েছিল মামুন। শেষ আর হয় নি।

শীতের শেষে গরম নেমে গেছে। দোকানে গোল্লাছুট খেলার মতো এলোপাথাড়ি বাতাস ঢুকছে। ঘূর্ণি বাতাসে মেয়েলি সুগন্ধি মামুনের নাকে ঢুকল। ডান তর্জনীতে নাক ঘষে সে গন্ধটা এড়াতে চাইল। এসব খুব বাড়াবাড়ি মনে মনে বলল। দোকানে লোকজন নেই বলে কি তার ঘাড়ে অশরীর ভর করছে। তার মনে পড়ল বিবাহের প্রথম রাতে ময়মুনার শরীরে পাউডারের এমন একটা গন্ধ ছিল। পাটালিগুড়, চিড়ার মোয়ার কৌটার পাশে পাইনএপেল ক্রিমের প্যাকেট বসাতে গিয়ে সে দেখল মেয়েটা নায়ক নায়িকার ভিউ-কার্ড দেখছে। শরীর নুয়ে। চুল সরে মুক্তোর মতো ঘাড় ভেসে উঠেছে । সে মনে করল সুরাইয়া গত শুক্রবারও দুপুরে এসেছিল। তবে কি মেয়েটা তার সঙ্গে সময় কাটাতেই এখানে আসে?

মামুন নিজেকে দাঁত কামড়ে অন্যত্র মনোযোগ দিল। পুরনো ম্যাগাজিনে তাকে একটা পত্রিকা উল্টে ছবি দেখছে । একবার মনে হল সুরাইয়া এমন কিছু রূপবতী নয়। ক্রিম সাবান ঘষলে লক্ষ্মীপেঁচাকেও সুন্দর লাগে। আর একটা বয়সে সব মেয়েই সুন্দরী হয় । দেখতে দেখতে সাধারণ হয়ে যায়। যেমন তার স্ত্রী ময়মুনার একটা ছবি তার মানিব্যাগে। থানার স্টুডিওতে তোলা। ছবিটা এক সময় বহুবার দেখলেও মন ভরত না। এখন ঘামে জলে কাগজটা ময়মুনার মতই ঝাপসা হয়ে গেছে। সে ব্যস্ত বাচ্চা সামলাতে। আগের সেই টানও নেই। মামুনের দ্বিতীয় সত্তা বাচ্চা শিশুর মতো মিঠাইওয়ালার ঘণ্টা শুনতে পেল। হিসাবের খাতা ফুঁড়ে বায়স্কোপের রঙিন ছবি ভেসে উঠল। প্রথমে সে দেখল একটা স্বচ্ছ নদী, তাতে এক জোড়া চোখ শালুকের মতো ভেসে যাচ্ছে। তারপর গোলাপি ঠোঁট। ঠোঁটটা ঘাসের মতো মসৃণ, সদ্য লেপানো উঠানের মতো ভেজা। একটা বুনো ঘুঘু এস বসল, ঠোকরাতেই মেয়েটা আহ্লাদে ককিয়ে উঠল। মামুন বাস্তবে ফিরে ঘাম মুছে মুখ গম্ভীর করে গুনল - তিন নয় সাতাশ আর হাতে থাকল তিন।

সুরাইয়া ডাকছে । হাতের মুঠোবন্দী ঠোঁট ফাটা ক্রিমের দাম কুড়ি টাকা শুনে সে অবাক হল। মামুন পাকা ব্যবসায়ীর মতো দাম বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতেই সে অন্য কিছু আনতে ফেরত গেল। সুরাইয়ার বাবা সারের ব্যবসা করে হঠাৎ বড়লোক হয়েছে। মেয়েটার এখন স্কুল পাস করার কথা। খবর নেই। এই বয়সে এত ফুটানি করতে দেয়া ঠিক না। পরক্ষণেই সে যুক্তি পেল এসব বিষয় ওর বাপ মা যা ইচ্ছা করুক । তার কাজ জিনিস বিক্রি। মামুনের নিজস্ব যুক্তিগুলো সবই হেরে যাচ্ছে।

মেয়েটাও মনে হয় তার ভাবনাগুলো বুঝে ফেলছে। সে চোখে চোখ পড়তেই অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল, ভাইজান, একটা কথা বলি, মনে নিবেন না। আপনে কি খুব কপাটি খেলতেন?

মামুন এড়াতে যাবে এমন ভাবে বলল,
খেলে তো অনেকেই। কিন্তু এই কথা ক্যান?
এমনেই। হুনছি যারা কপাটি খেলে তারা আপনের মতন উচালম্বা হয়।

এইবার হাসল মামুন। এই সব আজব কথা কার মুখে শোনা?

মেয়েটা আর শুনল না। চারদিকে কেউ নেই দেখে নিচু গলায় বলল,
একটা কথা কই ভাইজান। কেউরে কইবেন না। আপ্নের দোকানের ফোনের নম্বর কত?

মামুন ঠিক বুঝতে পারলনা। সে ভাবল অনেকেই তার নম্বর নেয়। ঢাকা থেকে ফোন করলে সে মোবাইল রিসিভ করার জন্য পয়সা নেয়।

মেয়েটা যেন তার বিবাহিত স্ত্রী এমন আহ্লাদ করে তাড়া দেয়,
কই দিলেন না নম্বর।

তার নিরবতায় হি হি করে হেসে ফেলছে মেয়েটা। মামুন রসিকতা করার মত কেউ না। মেয়েটা কি তার দুর্বলতা টের পেয়েছে - মামুন শক্ত হতে চাইল।

ঠিক তখনই মামুনকে অবাক করে দিয়ে সুরাইয়া তার ঝুলানো কাল ব্যাগের বোতাম টস করে খুলে ফেলল । তারপর একটা নতুন মোবাইল বের করে খুব কাছে এসে বলল, ভাইজান, আমারে একটু দেখাইবেন এইডা দিয়া কেমনে ফোন করে?

1-6 of 6